Recent Posts

6/recent/ticker-posts

কালা যাদু- ১০ (কালো ছায়া, সাদা আলো )

 




আমি ঠিক জানি না কখন থেকে সব কিছু কেমন গুলিয়ে যেতে শুরু করল।
অফিসে ভালো কাজ করেও বসের ধমক খাই, সহকর্মীরা মুখে হাসলেও পেছনে কাঁটা।
বাড়িতে ফিরে শান্তি তো দূরের কথা, মা–বাবার কথাতেও কেমন অস্থিরতা।
সব কিছু মিলে একটা বিষাক্ত ঘূর্ণিতে যেন আটকে গিয়েছিলাম—অকারণ হতাশা, ভয়, কান্না।
তখনই জীবনে এলেন নূর ভাই।
মসজিদের পাশের পুরোনো বইয়ের দোকানে দেখা হয়েছিল প্রথম।
সাদা পাঞ্জাবি, চোখে অদ্ভুত দীপ্তি।
একবারেই অন্যরকম মানুষ।
হাত ধরেই বললেন, “ভাই, তোমার চারপাশে ঘন অন্ধকার, বুঝি?”
আমি অবাক। “আপনি কীভাবে বুঝলেন?”
তিনি শুধু বললেন, “এইসব তুমি বোঝো না। কোনো আত্মীয় দীর্ঘকাল আগে তোমার নামে কিছু করেছে। খুব শক্তিশালী কালা যাদু। রাতের বেলা ঘুম ভাঙে তো?”
আমি মাথা নাড়লাম—হ্যাঁ।
নূর ভাই বললেন, “চলো একদিন আমার বাসায়। সব খুলে বলব।”
সন্ধ্যার পর নূর ভাইয়ের বাড়ি।
বাড়িটার চারপাশে ছিল গন্ধরাজ গাছ, প্রদীপের আলো, আগর বাতির গন্ধে ভরা অদ্ভুত পরিবেশ।
ঘরে ঢুকে মনে হলো, যেন শতাব্দী প্রাচীন কোনো সাধকের কুটিরে ঢুকেছি।
একপাশে আগরবাতি, অন্যপাশে কিছু কিতাব আর পুরনো কাঁসার পাত্রে জল।
নূর ভাই চোখ বন্ধ করে বললেন, “বসো। এখন হাজিরা করব। জ্বীন আসবে।”
আমার গা কাঁপছিল, কিন্তু কৌতূহল আটকে রাখতে পারিনি।
তাঁর মুখ দিয়ে মৃদু মন্ত্র ধ্বনি বের হচ্ছিল। হঠাৎ বাতাস থেমে গেল।
ঘরে জ্বলানো বাতি নিভে গেলো, শুধু আগরবাতির ধোঁয়া ঘূর্ণির মতো উঠে যাচ্ছে।
তখনই একটা ফিসফিসে আওয়াজ — “তোমার এক খালা… তাঁর দিক থেকে কাজ হয়েছে। মাটির পুতুলে গড়া ছিল তোমার অবয়ব।”
আমি স্তব্ধ।
নূর ভাই চোখ খুলে বললেন, “তোমাকে মুক্ত করতে হলে শ্মশানে যেতে হবে। ওখানেই বাঁধা আছে তোমার শক্তি। যে জায়গায় তোমার নাম পুঁতে রেখেছিল ওরা।”
রাতের শ্মশান।
আমার জীবনে অনেকবার শ্মশানে গেছি।
নূর ভাই কাঁধে ঝোলা, হাতে ধূপ, গলায় তাবিজ ঝোলানো মালা।
চারপাশে ঘন অন্ধকার, মনে হচ্ছে শুধু কিছু দূরে একটা চিতা ধিকিধিকি জ্বলছে।
নূর ভাই বললেন, “চোখ বন্ধ রাখো, কিছুতেই পেছনে ফিরো না। যাই দেখো না কেন, চুপচাপ থাকো।”
আমি চোখ বন্ধ করলাম।
মন্ত্র চলতে লাগল। বাতাস ভারী হয়ে এল। ঠাণ্ডা লাগতে লাগল অস্বাভাবিকভাবে।
একসময় মনে হলো পায়ের নিচে কেঁপে উঠল মাটি।
কানে কানে কারা যেন চাপা গলায় কাঁদছে, ফিসফিস করছে আমার নাম ধরে…
নূর ভাই জোরে মন্ত্র উচ্চারণ করলেন—
“ইয়া হায়িল, ইয়া কাহার, ইক্তাল হাদাল বালা!”
বাতাস গর্জে উঠল। আমার শরীর হালকা লাগল। যেন এক অদৃশ্য ভার মুক্ত হলাম।
-----------
আজ আমি স্বাভাবিক জীবন যাপন করছি।
অফিসে উন্নতি হচ্ছে, বাড়িতে সবাই ভালো ব্যবহার করছে, শরীর হালকা, মন শান্ত।
তবুও মাঝে মাঝে রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়।
দেয়ালে অন্ধকারে একটা ছায়া দেখি—চলে যায় ধীরে ধীরে।
আমার বুকের ভিতর ভয় জমে ওঠে, “ওরা আবার ফিরল না তো?”
তখনই মনে পড়ে—
নূর ভাই তো আছেন।
কিন্তু…
তিন সপ্তাহ ধরে নূর ভাইয়ের ফোন বন্ধ।
তাঁর বাসার দরজায় তালা।
আবার আমার বাড়ির আশপাশে এখন রাতে অদ্ভুত ধোঁয়া দেখা যায়,
আর বাতাসে ভেসে আসে এক অজানা ফিসফিস…..........

Post a Comment

0 Comments