Recent Posts

6/recent/ticker-posts

ট্রেন্ড নাকি আত্মার আহবান?




কলকাতার এক প্রত্যন্ত পাড়ায়, যেখানে পুরনো বাড়িগুলোর দেয়ালে সময়ের দাগ আর গাছের ছায়া মিলেমিশে একাকার, সেখানে একটি পুরনো তিনতলা বাড়ির কোণের ফ্ল্যাটে থাকত রিয়া। বাইরে থেকে দেখলে বাড়িটা সাধারণ মনে হলেও, স্থানীয় লোকজন বলত, এই বাড়ির তিনতলায় কিছু অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। কেউ কেউ বলত, রাতে জানালায় ছায়া দেখা যায়, যেখানে কেউ থাকার কথা নয়। রিয়া এসব গল্পে হাসত। তার জন্য জীবন ছিল তার ফোন, সোশ্যাল মিডিয়া, আর ভিডিও কনটেন্ট তৈরি। কিন্তু সে জানত না, একটি নিরীহ ভিডিও তার জীবনকে চিরতরে বদলে দেবে।


সেদিন ছিল একটি বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যা। রিয়া তার ফোন নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রল করছিল। হঠাৎ তার চোখে পড়ল একটি পোস্ট—“হলুদ জল ট্রেন্ড”। একটি কাঁচের গ্লাসে হলুদ জল ভরে, মোমবাতির আলোয় রেখে একটি ভিডিও বানানো। কমেন্টে সবাই উত্তেজিত: “এটা ভাইরাল হবে!”, “সুপার কুল!”, “একটা মিস্টিক ভাইব আছে!” রিয়া ভাবল, “এ তো পারফেক্ট! একটা ড্রামাটিক রিল বানিয়ে ফেলি।”


সে তার ছোট্ট ফ্ল্যাটের টেবিলে একটি পুরনো কাঁচের গ্লাস বের করল। গ্লাসটার গায়ে কিছু অদ্ভুত নকশা ছিল, যেন কেউ খোদাই করে কিছু লিখেছে। রিয়া এসবের দিকে মন দেয়নি। সে জল ভরে তাতে এক চিমটি হলুদ গুঁড়ো মিশিয়ে দিল। গ্লাসটা রাখল একটি জ্বলন্ত মোমবাতির পাশে। মোমবাতির আলোয় হলুদ জলটা যেন সোনার মতো ঝলমল করছিল। রিয়া তার ফোনের ক্যামেরা অন করে একটি ভয়েসওভার দিল—“এই হলুদ জলের রহস্য কী? জানতে চাও? তাহলে ফলো করো!” ভিডিওটা পোস্ট করে সে হাসতে হাসতে বন্ধুদের গ্রুপে শেয়ার করল। 


রাত গভীর হলে তার ফোন বেজে উঠল। একটি অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ: “তুমি কী করেছ, জানো না। গ্লাসটা ভেঙে ফেলো, এখনই।” রিয়া ভ্রু কুঁচকে মেসেজটা ডিলিট করে দিল। “কে এমন মজা করছে?” সে ভাবল। কিন্তু ঘুমের মধ্যে তার মনে হল, কেউ তার নাম ফিসফিস করে ডাকছে। শব্দটা এতটাই স্পষ্ট ছিল যে সে ধড়ফড় করে উঠে বসল। ঘর অন্ধকার। শুধু জানালার কাছে একটি ম্লান ছায়া যেন নড়ে উঠল।


পরদিন সকালে রিয়া ঘুম থেকে উঠে অস্থির বোধ করল। তার মাথা ভারী, চোখে জ্বালা, আর শরীরে একটা অদ্ভুত ক্লান্তি। সে ভাবল, হয়তো রাতে ভালো ঘুম হয়নি। দিনের বেলা সে তার রুটিনে ফিরে গেল—কিন্তু কিছু একটা ঠিক ছিল না। তার ফ্ল্যাটের দেয়ালে ছায়াগুলো যেন অস্বাভাবিকভাবে গাঢ়। দরজার কাছে দাঁড়ালে মনে হচ্ছিল, কেউ তার পিছনে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে। সে ঘুরে তাকালে কেউ থাকত না। 


সন্ধ্যায় সে আবার ভিডিও বানানোর জন্য ক্যামেরা সেট করল। কিন্তু তার চোখ পড়ল টেবিলের উপর। সেই কাঁচের গ্লাসটা এখনো সেখানে, হলুদ জল ভর্তি। “আরে, এটা তো ফেলে দেওয়ার কথা ছিল,” সে নিজেকে বলল। গ্লাসটা হাতে নিতেই তার হাত কেঁপে উঠল। জলের মধ্যে একটা অস্পষ্ট ছায়া নড়ছে—যেন কেউ ভিতর থেকে তাকে দেখছে। সে তাড়াতাড়ি গ্লাসটা রেখে দিল। 


রাতে, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মুখ ধোয়ার সময় তার চোখ পড়ল আয়নায়। তার পিছনে একটা ছায়া—ফ্যাকাশে, অস্পষ্ট, কিন্তু স্পষ্টভাবে মানুষের মতো। সে চিৎকার করে ঘুরে তাকাল—কেউ নেই। তার হৃৎপিণ্ড দ্রুত চলতে শুরু করল। “এটা আমার মনের ভুল,” সে নিজেকে শান্ত করল। কিন্তু ঘুমের মধ্যে সেই ফিসফিস আবার ফিরে এল—“রিয়া… তুমি আমাদের ডেকেছ…”


তৃতীয় দিনে রিয়া আর আয়নার দিকে তাকাতে পারছিল না। প্রতিবার আয়নার সামনে দাঁড়ালে, তার নিজের প্রতিবিম্বের পাশে একটা মুখ ভেসে উঠছিল। মুখটা কখনো হাসছে, কখনো কাঁদছে, কখনো শুধু তাকিয়ে আছে—চোখ দুটো যেন কালো গর্ত। তার ফ্ল্যাটের বাতাস ভারী হয়ে উঠছিল। দরজা-জানালা বন্ধ থাকলেও, মাঝে মাঝে একটা ঠান্ডা হাওয়া তার ঘাড় ছুঁয়ে যাচ্ছিল। 


সে তার বন্ধু তানিয়াকে ফোন করল। “তানিয়া, আমার সঙ্গে কিছু অদ্ভুত হচ্ছে। আমি ভয় পাচ্ছি।” তানিয়া হেসে বলল, “তুই ওই হলুদ জলের ভিডিও বানিয়েছিস, তাই না? আরে, ওটা তো মজার ট্রেন্ড। ভয় পাচ্ছিস কেন?” কিন্তু তানিয়ার কণ্ঠে একটা অদ্ভুত গাম্ভীর্য ছিল। ফোন কেটে যাওয়ার পর রিয়ার মনে হল, তানিয়ার কণ্ঠ যেন তার নিজের নয়। 


সেই রাতে, জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে তার কানের কাছে একটা নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা গেল। ঠান্ডা, স্পষ্ট, যেন কেউ তার ঘাড়ে ফুঁ দিচ্ছে। সে চিৎকার করে পিছিয়ে গেল। জানালায় কেউ নেই। কিন্তু জানালার কাঁচে একটা হাতের ছাপ—আঙুলগুলো অস্বাভাবিকভাবে লম্বা, নখগুলো ভাঙা। রিয়া দরজা-জানালা আরও শক্ত করে বন্ধ করল, কিন্তু ঘরের ভিতরে যেন কিছু একটা ঘুরছে। 


চতুর্থ দিনে রিয়ার শরীর দুর্বল হয়ে পড়ল। তার কাঁধে যেন কেউ চেপে বসেছে। প্রতি পদক্ষেপে মনে হচ্ছিল, কেউ তার পিছনে হাঁটছে। তার ফোন বারবার বেজে উঠছিল—অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ: “তুমি দ্বার খুলেছ। আমরা এসেছি।” সে ফোনটা বন্ধ করে দিল, কিন্তু তাতে কিছু হল না। তার ঘরের দেয়ালে ছায়াগুলো এখন নড়ছে, যেন কেউ তার চারপাশে ঘুরছে। 


সে তার ফ্ল্যাটের একমাত্র পুরনো বইয়ের তাকে হাতড়ে একটি বই পেল—“প্রেতবিধান”। বইটার চামড়ার কভারে ধুলো জমে ছিল, পাতাগুলো হলুদ হয়ে গিয়েছিল। সে কাঁপা হাতে পাতা উল্টাল। একটি অধ্যায়ে তার চোখ আটকে গেল—“তমসা দারোহণ”। সেখানে লেখা ছিল:


> “কাঁচ, জল, ও হলুদ একত্রে প্রেতলোকের দরজা খোলে। যে এই আহ্বান করে, সে নিজেই দ্বার হয়ে যায়। একবার দরজা খুললে, তা বন্ধ করতে হয় নির্দিষ্ট মন্ত্র ও রিচুয়ালে। না হলে, আত্মারা আহ্বানকারীর শরীরে প্রবেশ করে।”


রিয়া ভয়ে কাঁপতে লাগল। সে বুঝতে পারল, সে অজান্তে একটি ভয়ানক তান্ত্রিক রিচুয়াল সম্পন্ন করেছে। বইয়ে আরও লেখা ছিল, পঞ্চম দিনে আত্মারা পুরোপুরি আহ্বানকারীর শরীর দখল করতে পারে। 


পঞ্চম দিনে রিয়ার শরীর এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ল যে সে বিছানা থেকে উঠতে পারছিল না। তার চোখের নিচে কালো দাগ, ঘুম আসছে না। প্রতিবার চোখ বন্ধ করলেই সে একটি মুখ দেখতে পাচ্ছিল—ফ্যাকাশে, চোখ দুটো কালো গর্ত, মুখে একটা ভয়ংকর হাসি। সে বুঝতে পারল, সময় ফুরিয়ে আসছে। 


“প্রেতবিধান” বইয়ে রক্ষার উপায় লেখা ছিল। রিয়া তাড়াতাড়ি একটি লাল কাপড় খুঁজে বের করল। তার দিদিমার দেওয়া একটি ছোট বোতলে গঙ্গাজল ছিল। সে লাল কাপড়ের উপর ধূপ ও প্রদীপ জ্বালাল, গঙ্গাজল ছিটিয়ে বলতে লাগল, “এই ডাক ভুল ছিল, ফিরে যাও।” কিন্তু তার কণ্ঠ কাঁপছিল। 


হঠাৎ ঘরের আলো ম্লান হয়ে গেল। কাঁচের গ্লাসটা নিজে থেকে নড়ে উঠল। জলের মধ্যে একটি মুখ ভেসে উঠল—এবার স্পষ্ট। “তুমি আমাদের ডেকেছ, রিয়া। এখন তুমি আমাদের।” মুখটার কণ্ঠ গভীর, অমানুষিক। রিয়া চিৎকার করে উঠল। 


সে গ্লাসটা তুলে ফেলতে গেল, কিন্তু বইয়ের সতর্কবাণী মনে পড়ল—গ্লাস ভাঙলে আত্মা তার শরীরে ঢুকে যাবে। সে গঙ্গাজল ছিটিয়ে মন্ত্র পড়তে লাগল। কিন্তু ঘরের বাতাস আরও ঠান্ডা হয়ে গেল। জানালায় সেই হাতের ছাপটা আবার ফুটে উঠল। এবার আরও স্পষ্ট—হাতটা যেন কাঁচের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। 


পঞ্চম দিন পেরিয়ে গেল, কিন্তু রিয়ার অবস্থা আরও খারাপ হল। তার শরীর যেন তার নিজের নয়। প্রতিবার সে আয়নার সামনে দাঁড়ালে, তার প্রতিবিম্ব বদলে যাচ্ছিল। তার মুখের জায়গায় সেই ফ্যাকাশে মুখটা হাসছে। তার কাঁধে ভার আরও বাড়ছিল। ঘরের কোণে কোণে ছায়াগুলো এখন আর অস্পষ্ট নয়—তারা নড়ছে, ফিসফিস করছে, তার নাম ধরে ডাকছে। 


সে তার শেষ চেষ্টা করল। রাত গভীর হলে সে ছাদে উঠে গেল। হাতে সেই কাঁচের গ্লাস। তার পিছনে যেন একটি ছায়া তাকে অনুসরণ করছে। ছাদে পৌঁছে সে গঙ্গাজল দিয়ে গ্লাসটা ধুয়ে ফেলল। তারপর মাটিতে রেখে বলল, “আমি ভুল করেছি। ফিরে যাও। আমি আর ডাকব না।” 


একটা ঠান্ডা হাওয়া বয়ে গেল। জানালার হাতের ছাপ মিলিয়ে গেল। ঘরের বাতাস হালকা হল। কিন্তু রিয়ার কাঁধে সেই ভার রয়ে গেল। সে ছাদ থেকে নিচে নামার সময় একটা শব্দ শুনল—যেন কেউ তার পিছনে হাঁটছে। সে ঘুরে তাকাল—কেউ নেই। কিন্তু তার পায়ের কাছে সেই কাঁচের গ্লাসটা পড়ে আছে। সে তো এটা ছাদে রেখে এসেছিল। 


সেই রাতের পর রিয়া আর কখনো হলুদ জলের ভিডিও বানায়নি। তার ফ্ল্যাটে সেই কাঁচের গ্লাসটা এখনো আছে, একটা বাক্সের মধ্যে লুকিয়ে। সে আর তাতে জল ভরে না। কিন্তু রাতে ঘুমের মধ্যে তার মনে হয়, কেউ তার নাম ফিসফিস করে ডাকছে। আয়নার সামনে দাঁড়ালে, সে এখনো সেই ফ্যাকাশে মুখটা দেখে—যে মুখ তার নিজের নয়। 


তার ফ্ল্যাটের দেয়ালে ছায়াগুলো এখনো নড়ে। জানালায় মাঝে মাঝে হাতের ছাপ ফুটে ওঠে। আর রিয়ার কাঁধে সেই ভার কখনো যায় না। সে বুঝতে পারল, “তমসা দারোহণ” শেষ হয়নি। কারণ যে দরজা একবার খোলে, তা পুরোপুরি বন্ধ হয় না। 


তার ফোনটা এখনো মাঝে মাঝে বেজে ওঠে। অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ আসে: “তুমি দ্বার। আমরা ফিরে আসব।” 


রিয়ার গল্প এখন পাড়ায় কিংবদন্তি। স্থানীয় লোকজন বলে, তার ফ্ল্যাটে এখনো রাতে আলো জ্বলে, কিন্তু কেউ সেখানে থাকে না। কেউ কেউ বলে, রাতে জানালায় একটি মুখ দেখা যায়—ফ্যাকাশে, চোখ দুটো কালো গর্ত। আর যারা হলুদ জলের ট্রেন্ডে যোগ দিতে চায়, তাদের স্থানীয় বুড়িরা সতর্ক করে: “হলুদ জলের খেলা খেলো না। তুমি শুধু ডাক দিচ্ছ না, তুমি দ্বার হয়ে যাচ্ছ।” 


*তমসা দারোহণ* কোনো ট্রেন্ড নয়। এটি একটি প্রাচীন আহ্বান, যা অন্ধকারের দরজা খোলে। আর একবার দরজা খুললে, তা বন্ধ করার ক্ষমতা কারো থাকে না।


❝ যদি তুমি হলুদ জলের খেলা খেলতে চাও, মনে রাখো: তুমি শুধু ডাক দিচ্ছ না, তুমি নিজেই অন্ধকারের দ্বার হয়ে যাচ্ছ। ❞

Post a Comment

0 Comments