কালা যাদু-১১ ("মৃতের ঘরে ফিরে আসা")
সকাল তখন ৭টা। আকাশে ঝুলে থাকা মেঘের নিচে অদ্ভুত রকম একটা নিস্তব্ধতা। এমনিতে এই সময়েই কাশিমপুর হাসপাতাল চত্বর বেশ কোলাহলপূর্ণ থাকে, কিন্তু আজ যেন পুরো হাসপাতাল থেমে গেছে। সাদা চাদরে মোড়া এক তরুণী পড়ে আছে মৃতদেহ রাখার কক্ষে। নাম তার সোহা আক্তার। বয়স মাত্র ২২। তিন দিন ধরে ‘জ্বীনে ধরা’ অবস্থায় ছিল। কিছুক্ষণ চিৎকার, কিছুক্ষণ নীরবতা, কখনো অদ্ভুতভাবে হেসে ওঠা—পরিবার বলছিল, "জ্বীন এসেছে শরীরে।"
হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাকে ভর্তি করেছিলেন মানসিক রোগী হিসেবে। ইনজেকশন, ঘুমের ওষুধ, সেডেটিভ, সব কিছুই চেষ্টা করে ফেলেছিলেন। কিন্তু শরীরে ছিল না কোনো ওষুধের প্রতিক্রিয়া, ছিল না কোনো সাড়া। তৃতীয় দিনে, হঠাৎ তার হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে যায়। ডাক্তাররা প্রায় ত্রিশ মিনিট চেষ্টা করেও তাকে ফেরাতে পারেননি। তাকে "মৃত ঘোষণা" করা হয়।
কিন্তু মৃতদেহ মোড়ানো অবস্থায়, যখন হাসপাতালের পেছনে খালি জায়গায় দাফনের প্রস্তুতি চলছিল, ঠিক তখনই হাজির হন একজন অপরিচিত মানুষ—একটি মাটির রঙের পাঞ্জাবি পরা, চোখে অদ্ভুত দীপ্তি, মাথায় সাদা কাপড়ের পাগড়ি—নূর ভাই।
পরিবারের কেউ তাকে চিনত না, কিন্তু তার চোখে এমন কিছু ছিল, যা কাউকে বাধা দিতে দেয়নি। তিনি সরাসরি মৃতদেহের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। তারপর তার পকেট থেকে বের করলেন এক পুরোনো কাগজে মোড়া তাবিজ, তাতে আরবিতে লেখা ছিল কিছু দোয়া, যা সাধারণ মানুষ পড়তেও পারবে না।
তারপর নূর ভাই ফিসফিস করে বলে উঠলেন,
“এই মেয়ে এখনও মরে যায়নি। ওকে ধরা হয়েছে। ওর দেহ নয়, ওর আত্মাই এখন কারাবন্দী।”
একটি ছোট পাত্রে জাফরানের কালিতে লেখা তাবিজ গুলে, তার কপালে এক নিখুঁত গোল দাগ এঁকে দেন। তারপর পড়তে থাকেন—"সূরা জিন", "সূরা ইয়াসিন" ও "দোয়া হায়াত"। পুরো হাসপাতালের বাতাস যেন ভারি হয়ে ওঠে। ঘরের বাতি বারবার জ্বলে ও নিভে যায়।
হঠাৎ, নিঃশব্দ ঘরের ভেতরে সোহা গাঢ় নিঃশ্বাস নেয়।
“ওর বুক ওঠানামা করছে! হৃদস্পন্দন... ফিরে এসেছে!”
ডাক্তার ছুটে এসে স্টেথোস্কোপ রাখেন বুকের ওপর—
"She’s alive! She's back!"
কিন্তু সোহার চোখ তখনও বন্ধ। কেবল ঠোঁট নড়ে—নূর ভাই তার কান পেতে শোনেন—
"সে গেছে... আমি ফিরে এলাম… বাঁচতে চাই।"
নূর ভাই ধীরে ধীরে তার পাশে বসে বলেন,
“তোমাকে ফেরানো হয়েছে। কিন্তু শর্ত আছে। পাঁচদিন সূর্যোদয়ের আগে ফজরের নামাজ পড়তে হবে, প্রতিদিন এক গ্লাস পানি ‘আয়াতুল কুরসী’ পড়ে পান করতে হবে। আর ঘরের দক্ষিণ কোণে রাখতে হবে একটি পবিত্র তাবিজ, যা আত্মার ভারসাম্য বজায় রাখবে।”
পরিবার হতবাক, ডাক্তাররা নির্বাক। যারা আধুনিক চিকিৎসায় সব চেষ্টা করে ফেলেছিলেন, তারা চোখের সামনে অলৌকিক এক জীবন্ত প্রত্যাবর্তন দেখলেন।
আজ তিন বছর পার হয়েছে। সোহা এখন পুরোপুরি সুস্থ। বিয়ে করেছে, সন্তান আছে এক। তবে প্রতি শুক্রবার সে একজোড়া গোলাপ নিয়ে যায় কাশিমপুর দরগাহর পেছনের সেই কবরস্থানের পাশে—যেখানে দাঁড়িয়ে একদিন নূর ভাই তাকে ফিরিয়ে এনেছিলেন মৃত্যুর চৌকাঠ থেকে।
“মরলে শেষ নয় সব। কোনো কোনো ডাক... ফেরায় মৃত্যু থেকেও।”
আর সেই ডাক যে দিতে পারেন—তার নাম নূর ভাই।
তিনি ডাকেন আলো দিয়ে, শব্দ দিয়ে নয়।
*#কালা_যাদু বইটি এমন ৫০টি ঘটনা নিয়ে আসছে। বিস্তারিত +8801715982155 (whatsapp)
0 Comments