শ্রীশ্রী আনন্দময়ী মা এর বাণী
“যে ভগবানের দিকে যাইবার জন্য লড়াই করে তাহার রসদ ভগবানই যোগান। সেজন্য ভাবনা করিতে হয় না।
সাধনা! সাধন মানে- সাধা। নিজেকে নেবার জন্য সাধা। অর্থাৎ 'আমাকে নেও', আমাকে নেও বলিয়া সাধা।”
— শ্রীশ্রী আনন্দময়ী মা
মায়ের কথায় “লড়াই” শব্দটি আক্ষরিক নয়, এটি এক আধ্যাত্মিক যুদ্ধ—যা আমাদের মনের ভেতরেই প্রতিনিয়ত চলতে থাকে। এই লড়াইতে একদিকে রয়েছে আত্মা, অপরদিকে মায়া। এই সংগ্রাম একান্তই আত্মিক—সেখানেই শুরু হয় সাধকের প্রকৃত যাত্রা।
এই পথে জড়তা কাটাতে হয়, অহংকার ছাড়তে হয়, নিজস্ব চিন্তাধারার সীমাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে আসতে হয়। এই সব কিছু করতে গিয়ে মানুষ এক সময় অনুভব করে, নিজের শক্তি সীমিত, কিন্তু আকাঙ্ক্ষা অসীম। তখনই ঈশ্বরের আশ্রয় জরুরি হয়ে ওঠে।
সাধনা কোনো নিছক নিজের চেষ্টা নয়, এটি এক ঈশ্বরীয় সহযাত্রা।
“তেষাং সদতযুক্তানাং ভজতাং প্রীতিপূর্বকম্।
দদামি বুদ্ধিযোগং তং যেন মা উপয়ান্তি তে॥”
(গীতা ১০/১০)
অর্থাৎ, যাঁরা ভক্তিসহকারে নিরন্তর আমাকে ভজেন, আমি তাঁদের সেই জ্ঞান দিই, যার দ্বারা তারা আমাকেই লাভ করে।
অতএব, সাধকের কাজ শুধু এগিয়ে চলা, আর ভগবানের কাজ তাঁকে ধরে রাখা।
“সাধনা মানে—সাধা। নিজেকে নেবার জন্য সাধা।” এই বাক্যটি এক অমূল্য দর্শন বহন করে। এখানে সাধনার অর্থ শুধুমাত্র ধ্যান, জপ, মন্ত্র নয়; বরং এটি এক আত্ম-প্রস্তুতি। নিজেকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে ঈশ্বর একদিন বলেন—“তোমাকে আমি নিলাম”। এখানে ‘নেওয়া’ মানে ঈশ্বরের চেতনার সঙ্গে নিজের চেতনার মেলবন্ধন। আমাদের মানসিক, চারিত্রিক, এবং আত্মিক প্রস্তুতি এমনভাবে হতে হবে যেন আমরা ঈশ্বরের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠি।
“আমাকে নেও”—এই একটিমাত্র বাক্যে মায়ের সাধনা ও ভক্তির সারসত্য নিহিত। এই উচ্চারণ ঈশ্বরের প্রতি এক অন্তহীন আকুলতা, এক ধৈর্যশীল প্রার্থনা। এটি এক পরিণত উপলব্ধি—যেখানে সাধক জানেন, তিনি নিজের দ্বারা ঈশ্বরকে অর্জন করতে পারবেন না; বরং ঈশ্বরই তাঁকে নিতে হবে।
রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের বলেছেন--
“ভগবানকে পাওয়া যায় না সাধনার দ্বারা, তিনি দয়া করলেই পাওয়া যায়।”
তবে সেই দয়া পাওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা জরুরি, আর এটাই হলো সাধা।
স্বামী পরমানন্দ বলেছেন--
"সাধনা দ্বারা কখনো ঈশ্বর লাভ করা সম্ভব না। বরং তার কৃপা হলেই তাকে লাভ করা যায়।"
যখন একজন সাধক জানেন, তাঁর যাত্রাপথের রসদ ঈশ্বর নিজেই দেবেন, তখন তাঁর আর নিজের যোগ্যতা, ভবিষ্যৎ, ফলাফল নিয়ে ভাবনার প্রয়োজন পড়ে না। এইভাবেই জন্ম নেয় এক নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ—যেখানে ভাবনা নেই, ভয় নেই, শুধু আছে এক গভীর আস্থা।
আনন্দময়ী মায়ের এই কথাগুলো কোনো দর্শনমাত্র নয়, এটি এক জীবন্ত অভিজ্ঞতা। যারা সত্যিকার সাধনায় নিমগ্ন, তারা জানেন—নিজের শক্তিতে নয়, ঈশ্বরের করুণায়ই সাধনা সিদ্ধ হয়।
“আমাকে নেও”—এই আকুতি যেন শুধু মুখের শব্দ না হয়, বরং হোক প্রতিটি শ্বাসের আর্তি, প্রতিটি কাজের উৎস। সেই আত্মসমর্পণের পথেই, বিনা চেষ্টার মধ্যেও ঈশ্বরের শক্তি আমাদের ভর করে। কারণ, এই লড়াইয়ে আমরা একা নই—তিনি সর্বদা আমাদের সঙ্গে, এমনকি আমাদের মধ্যেই।
✍️ তাৎপর্য ব্যাখ্যাঃ রতন কর্মকার
(লেখাটি গুপ্ত সাধক শ্রদ্ধেয় Santonu Shobho দাদাকে উৎসর্গ করলাম।)

0 Comments