Recent Posts

6/recent/ticker-posts

ক্রিয়াযোগে ব্রহ্মচর্য

 



*#ক্রিয়াযোগে_ব্রহ্মচর্য

ব্রহ্মচর্য শব্দটির আক্ষরিক অর্থ ‘ব্রহ্মে আচরণ’—অর্থাৎ সেই জীবনযাপন যেটি ব্রহ্ম বা পরমসত্যের দিকে ধাবিত হয়। হিন্দু দর্শনে ব্রহ্মচর্য শুধুমাত্র যৌনসংযম নয়; এটি এক বিস্তৃত আধ্যাত্মিক জীবনদর্শন, যার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য আত্মার উত্তরণ এবং আত্মজ্ঞানলাভ। আর ক্রিয়াযোগ সেই প্রাচীন তন্ত্র ও যোগপদ্ধতির একটি শাখা, যেখানে প্রাণশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে, ধ্যান ও মুদ্রার মাধ্যমে আত্মসচেতনতার জাগরণ ঘটানো হয়। 

প্রচলিত ধারণায়, ব্রহ্মচর্য মানেই যৌনতা থেকে বিরত থাকা। কিন্তু উপনিষদ ও যোগশাস্ত্রে দেখা যায়, এটি হল ইন্দ্রিয়সংযম, চিন্তার বিশুদ্ধতা এবং আত্মদর্শনের একটি প্রস্তুতিপর্ব। মুন্ডক উপনিষদে বলা হয়েছে:

"ব্রহ্মচর্যেণ তপসা দেবতা ব্রহ্ম বিদ্যাং প্রত্যবসত।"

অর্থাৎ ব্রহ্মচর্য ও তপস্যার মাধ্যমে দেবতারা ব্রহ্মবিদ্যার অধিকারী হন।

এখানে ব্রহ্মচর্য হলো এক গভীর শৃঙ্খলা, যা ইন্দ্রিয়কে অন্তর্মুখী করে এবং মনকে একাগ্রতার পথে চালিত করে।

ক্রিয়াযোগ যোগপদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল যৌনশক্তির রূপান্তর। এখানে কামশক্তি দমন করা হয় না, বরং সেটিকে উর্ধ্বমুখী করে আত্মোপলব্ধির পথে নিয়োজিত করা হয়.

ক্রিয়াযোগের মাধ্যেমে ব্রহ্মচর্য অর্জিত হয় শুধু বাহ্যিক নিয়মনিষ্ঠার মাধ্যমে নয়, বরং শরীরের ভেতরকার শক্তির অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে। এই অভ্যাসে কয়েকটি স্তর গুরুত্বপূর্ণ:

মূলবন্ধ, যৌন শক্তিকে উপরের দিকে তুলতে সাহায্য করে। কামশক্তিকে প্রেম, নিবেদন ও বাচনের বিশুদ্ধতায় রূপান্তরিত করে। ইচ্ছাশক্তিকে কেন্দ্রীভূত করে কামনাকে ব্রহ্মজিজ্ঞাসায় পরিণত করে।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় ব্রহ্মচর্য কেবল নিষেধ নয়—এ এক সৃষ্টি, এক অভ্যন্তরীণ স্থিতির বিকাশ, যা আত্মা ও পরমাত্মার মিলনে সহায়ক।

ক্রিয়াযোগ সাধারণত গুরু থেকে দীক্ষার মাধ্যমে শুরু হয়। কারণ এই যোগপদ্ধতিতে শারীরিক ও মানসিক বহু সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটে, যা সঠিক দিশা ছাড়া বিপজ্জনকও হতে পারে। গুরু শিষ্যকে শেখান কীভাবে ব্রহ্মচর্যকে বাহ্যিক সংযমের বাইরে এনে আত্ম-জাগরণের পথে রূপান্তর করা যায়।

ক্রিয়াযোগ আমাদের শেখায়—যৌন শক্তি দমনের বস্তু নয়, বরং এক মহান উৎস, যাকে নিয়ন্ত্রণ করে, উপরের দিকে প্রবাহিত করে, আমরা ব্রহ্মজ্ঞানলাভে এগোতে পারি। ব্রহ্মচর্য তখন শুধুমাত্র একটি নিয়মনিষ্ঠ জীবনধারা নয়, বরং এক চেতনার স্তর, যেখানে কাম রূপান্তরিত হয় প্রেমে, প্রেম রূপান্তরিত হয় ধ্যানে, আর ধ্যান রূপ নেয় আত্মস্বরূপে।

✍️ রতন কর্মকার

Post a Comment

0 Comments