Recent Posts

6/recent/ticker-posts

সন্ধান (৩য় পর্ব)

 



সন্ধান (৩য় পর্ব)

৩য় পর্ব: তন্ত্রের রহস্য

অনিক যখন ইসকন ত্যাগ করেছিল, তখন তার মনে এক গভীর তৃষ্ণা ছিল—যে তৃষ্ণা তাকে জীবনের আরও গভীরে প্রবাহিত করেছিল। সে উপলব্ধি করেছিল, আধ্যাত্মিকতার পথে যে শান্তি ও শক্তি পাওয়া যায়, তা কেবল বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নয়, বরং এক গভীর অভ্যন্তরীণ যাত্রার মাধ্যমে পাওয়া যায়। সে আরও বিশ্বাস করেছিল, পৃথিবীর রহস্য ও জীবনের আসল অর্থ খুঁজে পাওয়ার জন্য তাকে এমন একটি পথ অনুসরণ করতে হবে, যা তাকে সত্যিকারের আত্মজ্ঞান এবং ঈশ্বরের সঙ্গে একাত্মতা এনে দেবে। এমনকি, যদি তাকে অতি গভীর ও রহস্যময় কিছু শিখতে হয়, তাহলে সেটাই তার জন্য উপযুক্ত হবে।

এই সময়ে তার কানে একটি খবর আসল, যা তার মনকে আরও উসকে দিল। এক তান্ত্রিক, যে শ্মশানে বসে কঠোর সাধনা করত, এবং বিভিন্ন অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিল, সে বহু মানুষের সমস্যা সমাধান করছিল। তার অলৌকিক শক্তির কথা শোনা গিয়েছিল, এবং অনেক মানুষ তার কাছে এসে সমস্যার সমাধান চাইত। অনিক ভাবল, এই তান্ত্রিক হয়তো তার সেই গভীর রহস্যময় শক্তির সন্ধান দিতে পারবেন, যা তাকে আধ্যাত্মিকভাবে পরিপূর্ণ করবে।

অনিক সেই তান্ত্রিকের কাছে যেতে মনস্থির করল। কিছুদিন পর সে শ্মশানে গিয়েছিল, সেখানে গিয়ে প্রথমেই তান্ত্রিকের অদ্ভুত পরিবেশ দেখে তার মধ্যে এক ধরণের ভয়, সম্মান ও কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছিল। শ্মশানটি ছিল একটি অন্ধকার পরিবেশ, কিন্তু তাতে গা ঠান্ডা বাতাস ও নিস্তব্ধতা ছিল যা এক ধরনের শক্তির উপস্থিতি অনুভব করাচ্ছিল। সেখানে আসা অন্য মানুষদের মতো, অনিকও তার প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এসেছিল। তান্ত্রিকটি তাকে প্রথমে একদৃষ্টিতে দেখেছিল, তার চোখে ছিল এক ধরনের গভীর অভিজ্ঞতা এবং শান্তির ছাপ। কিছুক্ষণ পর, তান্ত্রিক ধীরে ধীরে বলেছিলেন, “তুমি যদি সত্যিকারের শক্তি অর্জন করতে চাও, তবে তোমাকে কঠোর সাধনায় বসতে হবে। তুমি যত কঠোর সাধনা করবে, তত বেশি শক্তি অর্জন করতে পারবে।”

অনিকের মনের মধ্যে তখন শূন্যতা এবং কৌতূহল ছিল। এই কথা শুনে তার ভিতরে এক নতুন আশা এবং চেতনা সৃষ্টি হল। মনে মনে সে ঠিক করল, "এটাই হতে পারে সেই পথ, যে পথ তাকে ঈশ্বর এবং শক্তির কাছে পৌঁছে দেবে।" সে তান্ত্রিকের কথামতো, একদম নির্দিষ্ট নিয়মে শ্মশানে রাতের পর রাত সাধনা করার সিদ্ধান্ত নিল। মন্ত্র উচ্চারণ, ধ্যান, শ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়ন্ত্রণ এবং শরীরের শক্তির উপর মনোনিবেশ—এ সমস্তই সে অভ্যন্তরীণ শান্তি ও শক্তির সন্ধানে শুরু করল। তবে প্রথম দিকে তার কোনো পরিবর্তন অনুভূত হচ্ছিল না। মনের মধ্যে অনেক সংশয় ছিল, কিন্তু তবুও সে বিশ্বাস করতে চেয়েছিল যে, এই সাধনার মাধ্যমে সে তার কাঙ্ক্ষিত শক্তি এবং জ্ঞান অর্জন করতে পারবে।

দিনের পর দিন, অনিক শ্মশানে গভীরভাবে সাধনা করতে লাগল। মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যে এক ধরনের রহস্যময় শক্তি অনুভব হতে শুরু করেছিল, তবে তাতে তার মন এক ধরনের একাগ্রতা অর্জন করেছিল। অনেক সময় সে বিভ্রান্ত হয়ে যেত, কখনো ভাবত—"এটাই কি প্রকৃত শক্তি? কিংবা আমি ভুল পথে তো হাঁটছি না?" কিন্তু, তার মধ্যে এক অদ্ভুত বিশ্বাস ছিল যে, এই যাত্রা তাকে একদিন সত্যের সন্ধান দিবে।

কিন্তু কিছুদিন পর, অনিক লক্ষ্য করল, তার মধ্যে যেটি শান্তি এবং শক্তির অনুভূতি জেগে উঠছিল, তা কখনো কখনো অন্যরকম হয়ে উঠছিল। তার মনে হচ্ছিল, সে যে শক্তি অর্জন করতে পেরেছে, সেটি হয়তো তাকে এক অন্য পথে নিয়ে যাচ্ছে। যতই সময় যাচ্ছিল, সে বুঝতে পারল, এই শক্তি কিছুটা বিপজ্জনক হতে পারে। শ্মশানে অন্যান্য তান্ত্রিকদের সঙ্গেও তার সাক্ষাৎ হলো। তারা সবাই একে অপরের সঙ্গে কথা বলছিল, তাদের মধ্যে কিছুটা গোপনীয়তা ছিল। কিছু তান্ত্রিক তাকে বলছিলেন, "এই শক্তি শুধুমাত্র আমাদের সাধনার মাধ্যমে আসে, কিন্তু এর সঙ্গে আমরা যা করি, তা একেবারে অন্যরকম।" অনিক আরও বেশি করে লক্ষ্য করতে লাগল যে, তান্ত্রিকরা এই শক্তি অর্জনের পর সেটা কোনভাবে ব্যবসায় পরিণত করত।

সে বুঝতে পারল, তান্ত্রিকরা তাদের শক্তি ব্যবহার করত মানুষকে সাহায্য করার পাশাপাশি তাদের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে কিছু টাকা কামাতে। একদিকে তারা মানুষের সমস্যার সমাধান করত, আবার অন্যদিকে তারা টাকা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতি করত। যে তান্ত্রিক একবার মানুষের সাহায্যে আসে, পরবর্তীতে সে সেই সাহায্যের জন্য একটি বৃহৎ অঙ্কের টাকা দাবি করত। সে তখন ভাবল, "এটা কি সত্যিই ঈশ্বরলাভের পথ? যদি ঈশ্বরের পথে যেতে হয়, তবে কেন এমন সব প্রক্রিয়া আর ব্যবসার মতো কাজ করতে হবে?"

অনিকের মনে তখন নানা প্রশ্ন ঘুরছিল। সে উপলব্ধি করল, এই শক্তি অর্জন করার মাধ্যমে তান্ত্রিকরা সত্যিকার শান্তি এবং ঈশ্বরের অনুসন্ধান করছে না, বরং তারা তাদের শক্তিকে ব্যবসায় পরিণত করছে, মানুষের দুর্বলতা এবং ভয়ের মধ্যে খেলা করছে। একদিকে তারা ঈশ্বরের সঙ্গে একাত্মতা দাবি করে, অন্যদিকে তারা মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ধোঁকা দেয় এবং অর্থ উপার্জন করে। এর মধ্যে কোনো শুদ্ধতা ছিল না, কোনো গভীরতা ছিল না।

অনিক অবশেষে সিদ্ধান্ত নিল, এটাই সঠিক পথ নয়। তান্ত্রিকদের শক্তি নয়, বরং একান্ত আত্মজ্ঞান এবং ঈশ্বরের প্রতি নির্ভরশীলতার মধ্যেই প্রকৃত শান্তি এবং শক্তি রয়েছে। এই শক্তির মোহ তাকে শুধুই বিভ্রান্তির দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। সে ভাবল, "প্রকৃত ঈশ্বরলাভের পথ তো মনের গভীরতা এবং আত্মবিশ্বাসের মধ্যে, কোনো বাহ্যিক শক্তির প্রদর্শনী বা অলৌকিক ক্ষমতার মধ্যে নয়।" তান্ত্রিকের কাছে গিয়ে, অনিক তার প্রশ্নগুলো প্রকাশ করল। "এই শক্তির মোহ কি সত্যিই ঈশ্বরের পথে নেওয়ার একমাত্র উপায়? কি সত্যিই ঈশ্বরলাভের পথ এত বিপজ্জনক এবং অশুদ্ধ?"

তান্ত্রিক কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, "শক্তি অর্জন সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু যে পথে তুমি হাঁটছো, সেটি প্রকৃত ঈশ্বরের পথ নয়। তোমার যদি প্রকৃত আত্মজ্ঞান ও ঈশ্বরলাভ করতে চাও, তবে তোমাকে এই সব অলৌকিক কাজের বাহ্যিক মোহ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ঈশ্বরের পথে চলা মানে শুধু শক্তি অর্জন নয়, বরং আত্মসুদ্ধি, নিজের আত্মার সঙ্গে মিলন, এবং প্রকৃত সত্যের সন্ধান।"

অনিক তখন বুঝতে পারল, তন্ত্রের এই রহস্য শুধুমাত্র বাহ্যিক শক্তি আর অলৌকিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত শক্তি আসলেই আত্মার মধ্যে নিহিত, আর ঈশ্বরের পথ সেখানেই খুঁজে পাওয়া যায়, যেখানে শুদ্ধতা, প্রেম, এবং বিশ্বাস থাকে। তাই, তান্ত্রিকের পথ থেকে ফিরে, অনিক তার আত্ম-অনুসন্ধান আরও গভীরভাবে শুরু করল, বিশ্বাস রেখে যে, আসল শান্তি এবং শক্তি একমাত্র ঈশ্বরের সত্যিক্রমেই পাওয়া যায়, অলৌকিক শক্তির প্রদর্শনীতে নয়।

চলবে....................

✍️ রতন কর্মকার

Post a Comment

0 Comments