Recent Posts

6/recent/ticker-posts

সন্ধান (২য় পর্ব)

 



সন্ধান (২য় পর্ব)

২য় পর্বঃ ইসকনি মোহ

অনিকের জীবনে একসময় এমন একটি সময় এসেছিল, যখন সে তার সবকিছুতে অগোছালো অনুভব করছিল। পৃথিবী এবং তার চারপাশের জগৎ তার কাছে অস্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। কাজের তাগিদ, সম্পর্কের জটিলতা, এবং একাকীত্ব—সব মিলিয়ে তার মনে একটা গহীন শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। একদিন, তার পুরনো বন্ধু শুভ্র তাকে ইসকন মন্দিরে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। শুভ্র বলেছিল, "তুমি যদি সত্যিকারের শান্তি খুঁজছো, তাহলে এখানে আসো।" অনিক, যেহেতু এমন কিছু খুঁজছিল, যে তাকে তার জীবনকে নতুন করে দেখতে সাহায্য করবে, তাই একদিন সে ইসকন মন্দিরে চলে গেল।

প্রথমবার যখন সে ইসকন মন্দিরে গিয়েছিল, তখন সে এক অদ্ভুত অনুভূতি অনুভব করেছিল। মন্দিরের ভেতরটা ছিল একদম শান্ত, পুরোটা ঘেরা ছিল গেরুয়া বসনধারী সন্ন্যাসীদের দ্বারা। সন্ন্যাসীদের আচরণ ছিল আন্তরিক এবং তাদের মধ্যে কিছু ছিল যা অনিকের মনকে আকর্ষণ করেছিল। তারা যেন সত্যিই এই জীবনকে গভীরভাবে অনুভব করছিল এবং সেটি অনিকের জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা ছিল। মন্দিরে ঢোকার পর, একদল ভক্তকে তাকে বলেছিল, "আসো, হরে কৃষ্ণ মন্ত্র জপ করতে থাকো, মন শান্ত হবে।" অনিক একে বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি, তবে যখন সে প্রথম মন্ত্রটি উচ্চারণ করেছিল, তখন সে একটি অদ্ভুত অনুভূতি অনুভব করেছিল—এক ধরনের শান্তি, যা সে আগে কখনও অনুভব করেনি।

কীর্তনের সুর, ঢোলের মৃদঙ্গ, আর মন্ত্রের ধ্বনির মধ্যে সে যেন এক অন্য পৃথিবীতে চলে গিয়েছিল। সে বুঝতে পারল, মন্দিরের এই পরিবেশ তাকে তার জীবনের সমস্ত দুঃখ ও যন্ত্রণা থেকে কিছুটা মুক্তি দিচ্ছিল। প্রথমে সে মন্দিরে যাওয়া অব্যাহত রাখল। সে মন্ত্র জপ করতো, প্রার্থনা করতো, এবং আরো গভীরভাবে শুদ্ধতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো। প্রতিদিন নতুন এক শান্তি ও প্রশান্তি তার মনকে পূর্ণ করে তুলছিল।

প্রথমদিকে, ইসকন মন্দিরের পরিবেশ অনিককে মনে হয়েছিল পরিপূর্ণ, কারণ এখানে অনেক কিছুই তার জন্য নতুন ছিল। সন্ন্যাসীরা তাকে নিয়মিত মন্দিরে আসার জন্য উৎসাহিত করছিল এবং অনিকও মনে করেছিল, "এটাই তো শান্তির পথ।" তবে কিছুদিন পর অনিকের মনে কিছু প্রশ্ন উঠে আসতে শুরু করল। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল, কেন সবাই একে অপরকে 'প্রভু' বলে ডাকে? তার কাছে এটি কিছুটা অস্বাভাবিক লাগছিল, কারণ, যেভাবে মানুষ একে অপরকে ‘প্রভু’ বলছে, তাতে মনে হচ্ছিল, তারা পরমেশ্বরের স্থানকে বিভক্ত করছে। তার মনে হত, ‘প্রভু’ তো একমাত্র পরমেশ্বর—তিনি হলেন কৃষ্ণ, এবং তাঁকেই সবকিছুর আধার হতে হবে। তাহলে কেন এই ভক্তরা একে অপরকে প্রভু বলে ডাকে?

এমন সময়, অনিকের মন আরও খোলামেলা হতে শুরু করল। সে বুঝতে পারল যে, কিছু কিছু ভক্তের মধ্যে অতিরিক্ত অন্ধবিশ্বাস এবং অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সন্ন্যাসীরা ও অন্যান্য ভক্তরা যেন সকল সিদ্ধান্তের জন্য একমুখী হয়ে থাকছিল, তারা বিশ্বাস করছিল, তাদের উপাস্য কৃষ্ণই সবার একমাত্র ভরসা এবং পথপ্রদর্শক। যেটা ছিল কিছুটা একপেশে—কেবলমাত্র তাদের ধর্মকর্মই সঠিক এবং বাহ্যিক অন্য কিছু অনুচিত।

এছাড়া, মন্দিরের মধ্যে এক অত্যন্ত পরিমিতি ও সংহতি ছিল। তবে শীঘ্রই অনিক বুঝতে পারল, এখানে খাবারের বিষয়ে এক অদ্ভুত নিয়ম রয়েছে। তারা সবাই একে অপরকে "প্রভু" বলে ডাকলেও, খাবারের ব্যাপারে ছিল এক ধরনের অদ্ভুত নিষেধাজ্ঞা—"প্রসাদ" ছাড়া অন্য কোনো খাবার গ্রহণ করা যাবে না। তার নিজের মা-বাবার রান্না করা খাবারও গ্রহণ করতে বলা হয়নি, কারণ তারা বলেছিল, "এই নিয়ম কঠোর ভাবে মানতে হবে।" তার কাছে এটি ছিল খুবই বিভ্রান্তিকর, কেননা মন্দিরের এমন নিয়মের মধ্যে তার নিজের পরিবারকে বাদ দেওয়া কিছুটা অস্বস্তিকর ছিল। তার মা, যিনি তার শৈশব থেকে তাকে ভালোবাসা দিয়ে খাবার তৈরি করে আসছেন, সেই খাবার সে খেতে পারবে না—এটি তাকে এক গভীর দুঃখে ফেলেছিল।

এছাড়াও, একদিন, অনিক মন্দিরে বেশ কিছু বিষয় লক্ষ্য করল, যা তাকে আরও অস্বস্তি দিয়েছিল। ইসকনে খুবই কঠোর নিয়ম ছিল—সব ভক্তদের এক ধরনের নির্দিষ্ট আচরণ ও ধারণা অনুসরণ করতে বাধ্য করা হতো। তিনি লক্ষ্য করলেন, এখানে অনেক কিছুই যেন খুব জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। বিশেষত, বেশ কিছু বিষয়ে সন্ন্যাসীদের বক্তব্যও তাকে বিরক্ত করতে শুরু করেছিল।

এক সন্ধ্যায়, মন্দিরে বৈদিক নৃত্য চলছিল, যা ছিল কীর্তনের অংশ হিসেবে অনেক পুরুষ ও মহিলাদের একত্রে নাচের আয়োজন। "হরে কৃষ্ণ" কীর্তনের ছন্দের নৃত্যের শেষ অংশে পুরুষ -মহিলারা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরা - এটি নিশ্চিত অসামাজিক কার্যকলাপ। অনিক প্রথমে এটিকে বিশুদ্ধ এবং আধ্যাত্মিক মনে করলেও, যখন সে আরো গভীরভাবে তাকালো, তখন এটিকে অশ্লীল এবং খুব অস্বস্তিকর মনে হলো। সে ভাবল, "এতটা শুদ্ধতার মধ্যে কেন এই ধরনের আচরণ?"

এছাড়া, কিছু সময় পর, অনিক জানতে পারল, ইসকনের বেশ কিছু গুরু এবং উচ্চপদস্থ ভক্তদের মধ্যে বেশ কিছু কেলেঙ্কারি নিয়মিত ধটে। নারীদের প্রতি অশ্লীলতা এবং আর্থিক দুর্নীতির মতো ঘটনা তার কানে আসতে শুরু করল। অনেক ভক্ত এবং গুরুরা, যারা নিজেদেরকে ‘পবিত্র’ বলত, তারা আসলে শাস্ত্রবিরুদ্ধ আচরণে লিপ্ত ছিল। এর মধ্যে, এক গুরু যিনি সম্প্রতি কিছু দেশের মধ্যে জনপ্রিয় ছিলেন, তার বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারি ও অপরাধের অভিযোগ উঠে আসে। এই খবর অনিকের কাছে অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর ছিল।

তাদের শাস্ত্র নিয়ে বাড়াবাড়ি, তাদের লেখা বইয়ে বিশেষ করে ইসকনের গীতায় শাস্ত্রের ভুলভাল ব্যাখ্যা, তারাই সঠিক আর বাকি সব পথ মিথ্যা, সব দেব-দেবী এমনকি মহাদেবও নাকি শ্রীকৃষ্ণের দাস - এসব তারা যেমন বিশ্বাস করে তেমনি অন্যের উপর আবোল তাবোল যুক্তি দাড় করিয়ে চাপিয়ে দিতে উঠেপরে লাগে।

অনেকে বলে, ইসকন সারা বিশ্বে হিন্দু ধর্মী প্রচার করছে। কিন্তু বাস্তবে তারা নিজেদের হিন্দু বলে স্বীকারই করে না। অনিক জানতে পারলো ইসকন আমেরিকান একটা সংস্থা। এটি ধর্ম প্রচারের নামে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত।

অনিক এও জানলো মন্দিরের নামে অনেকের জায়গা জমি এরা কেড়ে নিয়ে তাদের নিঃস্ব করে দিয়েছে। আর সেখানে তৈরী করেছে ব্যয়বহুল বিশাল বিশাল মন্দির যার প্রাথমিক ইমভেস্টমেন্ট করেছে আমেরিকা এবং এজন্য মাসে মাসে বিপুল অংকের টাকা তাদেরকে সুদ সমেত ফেরত দিতে হয়। অনিক এখন স্পষ্ট বুঝতে পারে একটা ব্যবসায়ী সংগঠন কখনোই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হতে পারে না।

এক্ষেত্রে, অনিক আরো স্পষ্টভাবে বুঝতে পারল যে, ইসকন কখনোই তার সঠিক পথচলার জায়গায় ছিলো না। সে ইসকনের "প্রশান্তি" এবং "আধ্যাত্মিকতা"কে ভুল কিছু হিসেবে চিনতে পারল। তার মনে হলো যে, ধর্মের নামে একধরনের ব্যবসা চলছে, যেখানে মানুষের বিশ্বাসের উপর ব্রেইন ওয়াশের ক্ষমতার প্রয়োগ করা হচ্ছে। এখানে, ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার আড়ালে অতি ব্যক্তিগত স্বার্থের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে।

অনিক ঠিক করল, সে আর এখানে থাকবে না। সে ইসকন ত্যাগ করল এবং নিজস্ব পথ খুঁজে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। সে জানতো, শান্তি এবং সত্যের সন্ধান বাইরের কিছু অনুসরণের মাধ্যমে সম্ভব নয়—বরং, নিজের আত্মবিশ্বাস এবং চেতনার মধ্যে থেকেই সেই পথ খুঁজে বের করতে হবে।

চলবে...............

(৩য় পর্বঃ তন্ত্রের পথ)

✍️ রতন কর্মকার

Post a Comment

0 Comments