Recent Posts

6/recent/ticker-posts

সন্ধান (৪র্থ পর্ব)

 



সন্ধান (৪র্থ পর্ব)

৪র্থ পর্ব: অনন্তের পথযাত্রা

অনিক যখন তার জীবনের সংকটের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল, তখন সে আর কোনো আশার আলো দেখতে পেত না। প্রতিদিনের রুটিনে ভরা একঘেয়েমি আর দুঃখের মাঝেই সে নিজের জীবনকে কাটিয়ে দিচ্ছিলো। অথচ, ঠিক সেই সময়ে তার মধ্যে এক অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি হলো, যেন কিছু একটা তার জন্য অপেক্ষা করছে, কিছু একটা তাকে অনুপ্রাণিত করবে, যা তাকে জীবনের গভীরতা উপলব্ধি করতে সাহায্য করবে। নিজের শূন্যতার অনুভূতি আর একাকীত্বের মাঝেই অনিক তার উত্তর খুঁজছিল।

একদিন সে গ্রামবাংলার এক কোণায় গিয়ে পৌঁছালো, যেখানে এক অখ্যাত সাধক থাকেন বলে শোনা গিয়েছিল। এই সাধক কোনো প্রতিষ্ঠিত মঠ বা সংঘের সাথে যুক্ত ছিলেন না। বরং, তিনি নিঃসঙ্গভাবে এক নদীর তীরে বসে ধ্যান করতেন। গ্রামের মানুষেরাও তাকে এক ধরনের রহস্যময় ব্যক্তিত্ব হিসেবে জানতো, কেউ হয়তো বিশ্বাস করতো, কেউ আবার তাকে অস্বীকার করতো। কিন্তু অনিকের মধ্যে যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল, তার জন্য সেটাই ছিল একমাত্র আশা।

অনিক জানতো, তার জীবন যদি বদলাতে পারে, তবে তা শুধুমাত্র এমন এক সাধকের কাছ থেকেই হতে পারে। সে তার ভেতরে এক অদ্ভুত কৌতূহল অনুভব করছিল, যেন এই সাধকের সামনে কিছু একটা বিরাট রহস্য উন্মোচিত হবে। কিছু না জানলেও, এই অসম্ভব অনুভূতি তার হৃদয়ে গভীরভাবে ফুটে উঠছিল।

গ্রামবাংলার সবুজ মাঠ পেরিয়ে, পিচঢালা ছোট রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে অনিক অবশেষে নদীর তীরে পৌঁছালো। দূরে একটা ছোট খুটির মতো একটা ঝোপঝাড়ের মধ্যে সাধক বসে ছিলেন। তার চোখে-মুখে শান্তির নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। সে আর কোনো শব্দ তৈরি করলো না, কেবল নীরবে তার দিকে এগিয়ে গেল। তেমন কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন চোখে পড়লো না, কিন্তু তাও অনিকের মধ্যে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ল। যেন, এখানে এসে সে নিজেকে পুনরায় খুঁজে পেলো।

অনিক যখন তার সামনে দাঁড়ালো, সাধক তার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। সেই হাসি ছিল কোনো সাধারণ হাসি নয়, তা যেন অনেক আগেই অনেক কিছু বুঝে ফেলা একটি হাসি। সাধক বললেন, "তুমি এসেছো, তাহলে ঠিক এটাই তোমার পথ।" তার কথা এতটাই মৃদু ছিল, কিন্তু ভেতরে এক ধরনের গভীরতা ছিল, যেন প্রতিটি শব্দ তার অন্তর থেকে বের হয়ে এসেছিল।

"কী চাও তুমি?" সাধক আরও বললেন।

অনিক এক মুহূর্ত চুপ থেকে বললো, "আমি আমার জীবনের পথ খুঁজে পাচ্ছি না। আমি জানি না, কোথায় যাবো, কীভাবে বাঁচবো। আমি কিছুটা হারিয়ে ফলেলেছি, আমি বিভ্রান্ত।"

সাধক মাথা ঝুঁকিয়ে কিছু সময় নীরব রইলেন। তারপর বললেন, "অনিক, তোমার ভেতর যা আছে, তা অমুলক। তুমি বাইরের জগতের দিকে তাকিয়ে যা খুঁজে চলেছো, তা তোমার ভেতরেই আছে। তুমি নিজেই সেই পথের সন্ধান পাবে, যা তুমি খুঁজে চলেছো।"

সাধকের কথা শুনে অনিকের মনে এক অদ্ভুত পরিবর্তন অনুভূত হলো। সে যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না, সে জীবনে এতদিন যা খুঁজছিল, তা তার নিজস্ব অন্তরে লুকানো ছিল। "কিন্তু, আমি কীভাবে পাবো?" অনিক জানতে চাইল।

সাধক মৃদু হেসে বললেন, "এটা খুব সহজ নয়। প্রথমত, তোমাকে বাইরের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির জগৎ সব সময়ই বিভ্রান্তি তৈরি করে। যখন তুমি এই বিভ্রান্তিকে দূর করতে পারবে, তখন তোমার আসল পৃথিবী ধীরে ধীরে উন্মোচিত হবে। ঈশ্বর কোনো বাহ্যিক প্রতিষ্ঠানে নেই, তিনি তোমার ভেতরেই আছেন।"

সাধকের কথাগুলো যেন অনিকের মনের গভীরে গিয়ে আঘাত করলো। সেই অনুভূতি তার শরীরের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে পড়লো। তাকে মনে হতে লাগলো, সে যেন কিছু একটা বড় সাদা পৃষ্ঠা খুঁজে পেয়েছে, যেখানে তার জীবনের নতুন লেখনী শুরু হতে যাচ্ছে। তার ভাবনা, তার অস্থিরতা, সবকিছু একবারে কোথাও হারিয়ে গেছে। সে যেন নতুন করে জন্ম নিলো।

সাধক আবার বললেন, "এই পথে তোমাকে এককভাবে চলতে হবে। কেউ তোমাকে সাহায্য করবে না, কারণ এটি তোমার নিজস্ব যাত্রা। বাইরের সবার মন্তব্য বা বিচার থেকে মুক্ত হয়ে, তোমার অন্তরের কণ্ঠ শুনে চলতে হবে। তবে মনে রেখো, এ পথ কখনোই সহজ হবে না। তবে যদি তুমি সত্যিকারের শান্তি চাও, তাহলে একমাত্র এই পথই তোমাকে তা দিতে পারবে।"

অনিকের মনে হলো, এ যেন তার জীবনের প্রথম ও শেষ জিজ্ঞাসা। সে ঠিক বুঝতে পারছিল না, এই শিক্ষাটা তাকে কতটা পাল্টে দেবে, তবে এটুকু সে বুঝতে পারছিল যে, এই সাধকের সাথে তার দেখা তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হতে চলেছে।

তাকে কোনো বুদ্ধি দেওয়া হয়নি, কোনো দিশা দেওয়া হয়নি, শুধুমাত্র তাকে নিজেকে জানার কথা বলা হয়েছে। সে বুঝতে পারলো, যে শান্তি সে খুঁজে পেয়েছিল, তা আসলে তার ভেতরে ছিল, শুধু তাকে সেটি খুঁজে বের করতে হবে।

চলবে................

✍️ রতন কর্মকার

Post a Comment

0 Comments