সন্ধান (১ম পর্ব)
প্রথম পর্ব: দীক্ষার দীর্ঘ প্রতীক্ষা
অনিক ছোটবেলা থেকেই আধ্যাত্মিক বিষয়গুলোতে গভীর আগ্রহী। সংসারের সুখ-দুঃখ, সফলতা-ব্যর্থতার ঊর্ধ্বে গিয়ে সে এমন কিছু খুঁজতে চেয়েছিল যা তাকে চিরস্থায়ী শান্তি দেবে। তার মনে হত, মানুষের জন্ম শুধুমাত্র খাওয়া, পরা, অর্থ উপার্জন করা আর সংসার চালানোর জন্য নয়। এই জীবন বড়ই ক্ষণস্থায়ী, এখানে কিছুই চিরস্থায়ী নয়।
সে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ পড়তে শুরু করল—বেদ, উপনিষদ, গীতা, পুরাণ, ত্রিপিটক, বাইবেল, কোরআন। বিভিন্ন মহাপুরুষদের জীবনকাহিনি পড়ে তার মনে হল, ঈশ্বরলাভই মানুষের চূড়ান্ত লক্ষ্য। কিন্তু সেই পথে হাঁটার জন্য কী করা উচিত, তা নিয়ে সে দ্বিধায় ছিল। তার মনে হত, শুধু বই পড়ে সত্যিকারের জ্ঞান পাওয়া সম্ভব নয়, এর জন্য চাই একজন যোগ্য গুরুর দীক্ষা।
অনেক চিন্তা-ভাবনার পর সে সিদ্ধান্ত নিলো, দীক্ষা গ্রহণ করা প্রয়োজন। কারণ দীক্ষাই প্রথম ধাপ, যা একজন সাধকের জীবনে প্রকৃত পরিবর্তন আনতে পারে। শাস্ত্র পড়েই যদি ঈশ্বরলাভ সম্ভব হতো, তাহলে এত গুরু, আশ্রম, মঠের প্রয়োজন হতো না। তাই একজন প্রকৃত গুরুর সন্ধান পাওয়াই এখন তার লক্ষ্য। অনেকের কাছেই সে পরামর্শ চাইল, আর তখনই কেউ তাকে বললো রামকৃষ্ণ মিশনের কথা।
*#দীক্ষার খোঁজে রামকৃষ্ণ মিশনে প্রবেশঃ
রামকৃষ্ণ মিশনের নাম সে আগেও শুনেছিল। সেখানে কঠোর নিয়ম-কানুন মেনে শিষ্যদের দীক্ষা দেওয়া হয়। মঠের জীবন সম্পর্কে অনেক গল্প শুনে সে একদিন সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। মনে একটা ভয় ছিল—সে কি সত্যিই প্রস্তুত? কিন্তু ঈশ্বরের পথে যেতে হলে দ্বিধা নয়, একাগ্রতা প্রয়োজন।
মিশনের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত শান্ত। চারদিকে শৃঙ্খলা আর ভক্তির আবহ। গেরুয়া বসন পরিহিত সন্ন্যাসীরা ধ্যানরত, কেউ গুরুদের সেবা করছে, কেউ বা প্রার্থনায় ব্যস্ত। একটা পবিত্রতা যেন পুরো পরিবেশকে আবৃত করে রেখেছে। মঠের দেয়ালে শ্রী রামকৃষ্ণ, মা সারদা আর স্বামী বিবেকানন্দের ছবি শোভা পাচ্ছিল। অনিক অনুভব করল, যেন সে এক নতুন জগতে প্রবেশ করেছে।
এক গুরুর সাথে দেখা করল সে। গুরু বেশ ধীরস্থির, চোখেমুখে শান্তির আভা। অনিক নমস্কার জানিয়ে বলল, “গুরুজি, আমি দীক্ষা নিতে চাই। আমি ঈশ্বরকে খুঁজছি, তার কাছে যেতে চাই।”
গুরু তার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। বললেন, “দীক্ষা শুধু একটি মন্ত্র নয়, এটি আত্মার জাগরন। তুমি কি সত্যিই প্রস্তুত?”
অনিক বলল, “আমি সবকিছু করতে প্রস্তুত।”
গুরু বললেন, “তাহলে তোমাকে কিছু নির্দিষ্ট বই পড়তে হবে। আমাদের গুরুদের বাণী, শ্রী রামকৃষ্ণের জীবনদর্শন, মা সারদার উপদেশ—এসব সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা জরুরি। এই বইগুলোর ওপর তোমার পরীক্ষা হবে। যদি তুমি উত্তীর্ণ হও, তবে তুমি সিরিয়ালে নাম পাবে। তবে তোমাকে অপেক্ষা করতে হবে—দীক্ষার সিরিয়াল আসতে ছয় মাস সময় লাগতে পারে।”
*#অনিকের দ্বিধাঃ
অনিকের মনে এক ধরণের অস্বস্তি কাজ করলো। ঈশ্বরলাভের মতো ব্যক্তিগত এবং পবিত্র একটি জিনিসের জন্য এত নিয়মকানুন! সে ভাবল, ঈশ্বরের কাছে যাওয়ার জন্য কি এত ধাপ, এত পরীক্ষা, এত অপেক্ষার দরকার? ঈশ্বর কি এত দূরে? তার মন বিদ্রোহ করলো।
তবুও, সে ভাবল, নিয়ম মেনে এগোবে। গুরুদের দেওয়া বইগুলো সংগ্রহ করল এবং রাতদিন পড়ে চলল। বইগুলো গভীর দার্শনিক, নীতিবাক্যপূর্ণ এবং গুরুদের বাণীতে পরিপূর্ণ ছিল। কিন্তু কিছুদিন পর তার মনে হল, এগুলো শুধুই তাত্ত্বিক জ্ঞান। এই জ্ঞানের অনুভূতির বই পড়ে হবে না।
তার মনে প্রশ্ন জাগল—শুধু বই পড়ে ঈশ্বরকে পাওয়া যাবে? ঈশ্বর কি কোনো গ্রন্থের মাঝে লুকিয়ে আছেন? না কি তিনি হৃদয়ের গভীরে? সে তার মনের সন্দেহ নিয়ে আবার গুরুর কাছে গেল।
গুরু শান্তভাবে বললেন, “সবাই কি একদিনেই উপলব্ধি পায়? প্রথমে জ্ঞান অর্জন করো, অনুভূতি আসবে পরে। ধৈর্য ধরো।”
কিন্তু অনিকের মনে হত, ঈশ্বর তো সব জায়গায় আছেন, তাহলে কেন তাকে খুঁজে পেতে এত ধাপের প্রয়োজন? কেন এত পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে?
*#অপেক্ষা ও প্রস্থানঃ
অনিক ছয় মাস অপেক্ষা করতে পারল না। তার মনে হল, সে হয়তো ভুল পথে এগোচ্ছে। যদি ঈশ্বর সত্যিই করুণাময় হন, তবে কেন তিনি এত পরীক্ষা নেন? কেন তাকে এত দেরি করতে হবে? তার মনে সংশয় জাগতে লাগল। সে ভাবল, যদি সত্যিই ঈশ্বরের দেখা পাওয়া যায়, তাহলে তা কি এত কঠিন হবে?
অনিক মঠের গুরুদের জানাল, সে আর অপেক্ষা করতে পারবে না। সে ঈশ্বরকে অন্যভাবে খুঁজবে। গুরুরা কিছু বলেননি, শুধু বললেন, “যাও, নিজের পথে খোঁজ করো। যদি মনে হয়, আবার ফিরে এসো।”
মিশন থেকে বের হয়ে আসার সময় তার মনে হল, হয়তো এই পথ তার জন্য নয়। হয়তো ঈশ্বর কোথাও অন্য জায়গায় তাকে ডাকছেন।
তার মনে অসংখ্য প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছিল। সে কি সত্যিই ঈশ্বরের কাছে যেতে পারবে? কোথায় খুঁজতে হবে তাকে?
(পরবর্তী পর্বঃ ইসকনি মোহ)
চলবে...............
✍️ রতন কর্মকার

0 Comments