Recent Posts

6/recent/ticker-posts

সাধন-ভজন

 



সাধন-ভজন

মানুষের জীবন দুই পর্যায়ে বিভক্ত—একটি হলো কর্মক্ষমতা থাকা অবস্থায় সাধনা করা এবং অপরটি হলো শারীরিক শক্তি হ্রাস পেলে ভজন করা।

***#সাধনা:

সাধনা ধর্মীয় বা আধ্যাতিক চর্চা। এটি সাধারণত কঠোর নিয়ম, তপস্যা, যোগ, ধ্যান, উপবাস, এবং অন্যান্য ধর্মীয় অনুশীলনের মাধ্যমে হয়ে থাকে। যখন শরীর শক্তিশালী ও কর্মক্ষম থাকে, তখন এই ধরনের কঠোর সাধনা সম্ভব।

***#ভজন:

ভজন বলতে বোঝানো হয়েছে ঈশ্বরের নামস্মরণ, গুণগান, কীর্তন, জপ এবং প্রেমভক্তি। এটি কঠোর নিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সহজ-সরল ভক্তির মাধ্যমে পরমাত্মার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা হয়। যখন শরীর দুর্বল হয়ে যায়, তখন সাধনার পরিবর্তে ভবজনই একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়ায়।

এই দুই অবস্থার মধ্যে একটি রূপান্তর ঘটে যখন বয়স বেড়ে যায় বা শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন কঠোর সাধনা করা সম্ভব না হলেও, ভবজন করা যায় এবং সেটাই মূল উপায় হয়ে ওঠে।

অনেকেই মনে করেন, যদি জীবনের কোনো বিশেষ সময়ে সাধনা না করা হয়, তাহলে পরে তা আর সম্ভব হবে না। কিন্তু স্বামী পরমানন্দ এই ধারণাকে অস্বীকার করে বলছেন—

"ঠিক আছে, বয়স হয়ে গেছে, কিন্তু তাই বলে কী ভগবানের নাম স্মরণ করা যাবে না? ভজন তো করা যাবে!"

এখানে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, বয়সের কারণে যদি কেউ কঠোর সাধনা করতে না পারেন, তাহলে শোক করার কিছু নেই। ভজনের পথ তখনো খোলা থাকে।

তাই, সময় চলে গেলেও হতাশ হওয়ার কিছু নেই। ভজনের জন্য কোনো নির্দিষ্ট বয়স বা সময়ের প্রয়োজন নেই। ঈশ্বরের নামগান ও স্মরণ যেকোনো বয়সে করা সম্ভব এবং সেটাও অন্যতম মুক্তির পথ।

স্বামী পরমানন্দ এখানে হাততালি দিয়ে ঈশ্বরের নামগান ও জপ করার পরামর্শ দিয়েছেন।

এই ভাবনাটি ভাগবত ধর্মের ভক্তিমার্গের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত।

ভবজনের গুরুত্ব কেন বেশি?

সহজ ও সরল উপায়: কঠোর সাধনার তুলনায় ভবজন করা সহজ এবং মানসিক শান্তি দেয়।

শরীরের ওপর নির্ভরশীল নয়: ধ্যান বা কঠোর যোগসাধনার জন্য শারীরিক শক্তি প্রয়োজন, কিন্তু ভজন শুধু মন ও হৃদয়ের ভক্তির ওপর নির্ভরশীল।

সর্বদা সম্ভব: ভজন ঘরে বসে, চলাফেরা করতে করতে, এমনকি রোগশয্যাতেও করা যায়।

ভগবানকে পাওয়ার সহজতম পথ: ভক্তির মাধ্যমে ঈশ্বরকে পাওয়া সহজ হয়।

শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন:

"সর্ব ধর্মান পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ" (ভগবদ্গীতা ১৮.৬৬)

অর্থাৎ, সকল ধর্ম ছেড়ে কেবল আমার শরণাগত হও।

ভজন কীভাবে করা যায়?

নাম সংকীর্তন: ঈশ্বরের নামগান করা।

জপ: নির্দিষ্ট মন্ত্র বারবার স্মরণ করা।

স্মরণ: ঈশ্বরের মহিমা নিয়ে চিন্তা করা।

পাঠ: গীতা, ভাগবত, রামায়ণ, বা অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ পাঠ করা।

কঠোর সাধনা যদি সম্ভব না হয়, তাহলে ভবজনের মাধ্যমে ঈশ্বরকে পাওয়া সম্ভব।

ভজন সর্বদা সম্ভব এবং এটি বয়স, সময় বা পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল নয়।

অনেক মানুষ বৃদ্ধ বয়সে এসে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তাঁরা ভাবেন—

"এখন তো আর কিছু করার নেই!"

"আমার জীবন বৃথা গেল!"

"এখন আর সাধনা সম্ভব নয়, তাই ভবিষ্যতেও কিছু হবে না!"

স্বামী পরমানন্দ এই হতাশাবাদী চিন্তার বিরোধিতা করেছেন। তিনি বলছেন—

বার্ধক্যে হতাশা নয়, বরং ভজন করা উচিত।

ভজন মানুষকে আনন্দ দেয়, দুঃখ ও হতাশা দূর করে। এটি পরকালের মুক্তির পথ প্রশস্ত করে।

ঈশ্বরচিন্তা ও নামগানের মাধ্যমে আত্মিক মুক্তি অর্জন করা যায়।

***#যতদিন শক্তি আছে, সাধনা করা উচিত।

যখন শারীরিক শক্তি কমে যায়, তখন ভজনই প্রধান উপায়। বয়স বা সময় চলে গেলেও হতাশ হওয়া উচিত নয়; ভজনের দরজা সর্বদা খোলা।

ভগবানের নামস্মরণই প্রকৃত মুক্তির পথ।প্রতিদিন কিছু সময় ভজনের জন্য রাখা উচিত।

বার্ধক্যে এসে হতাশ না হয়ে, ভগবানের নামগানে আনন্দ খুঁজে নেওয়া উচিত। সাধনার জন্য বয়সের অপেক্ষা না করে এখন থেকেই শুরু করা উচিত।

✍️ তাৎপর্য ব্যাখ্যা : রতন কর্মকার

Post a Comment

0 Comments