ক্রিয়াযোগী_রবীন্দ্রনাথ
*#বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সারাজীবন ধরে বহু সাধুসন্তের সান্নিধ্যে এলেও ক্রিয়াযোগ এবং ক্রিয়াযোগীগণের সাথে আজীবন তাঁর নিবিড় সম্পর্ক ছিল। আর সেই সকলস্তরের সাক্ষাতের অমূল্য তথ্য তেমনভাবে উন্মোচিত না হওয়ায় অনেকেই জানেন না যে কবিগুরু কেবলমাত্র একজন কবিই নন বিখ্যাত যোগীও ছিলেন।
*#বিভিন্ন লেখনিতে সেই সব কথাই মূর্ত হয়ে উঠে। তার মাঝে কিছু কিছু তুলে ধরলাম- বাল্যকাল হতেই তিনি তাঁর পিতৃদেব মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নির্দেশ মতো গায়ত্রী মন্ত্র জপ ও ধ্যান করিতেন।১
জীবন সায়হ্নে তিনি যোগীরাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয়ের অন্যতম শিষ্য পরম পূজ্যপাদ শ্রীশ্রী ভূপেন্দ্রনাথ সান্যাল মহাশয়ের নিকট ক্রিয়াযোগে দীক্ষা লাভ করেছিলেন। ১৯০০ সালের কোনও এক সময় একটি বিশেষ ঘটনার মধ্যদিয়ে বোলপুরে প্রথম সান্যাল মহাশয়ের সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাক্ষাৎ হয়।২
*#তখন সান্যাল মহাশয়ের বয়স মাত্র ২৬ বৎসর। সেই সময় তাঁদের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ বিভিন্ন বিষয়ের উপর আলোচনা হয়। তারপর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে শ্রীশ্রী ভূপেন্দ্রনাথ সান্যাল মহাশয়ের এক নিবিড় আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয় ও সান্যাল মহাশয় ঠাকুর পরিবারে গৃহশিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত হন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদা এবং পরিবারের সকলেই শ্রীশ্রী ভূপেন্দ্রনাথ সান্যাল মহাশয়কে গুরুজ্ঞানে শ্রদ্ধা ও ভক্তি করতেন।৩
আবার দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্বন্ধে বলতে গিয়ে সান্যাল মহাশয় ঋষিকল্প মহাত্মা বলে উল্লেখ করেছেন।৪
*#প্রসঙ্গত উল্লেখ্য দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ্য পুত্রবধূ শ্রীযুক্তা হেমলতা ঠাকুর আজীবন শ্রী ভূপেন্দ্রনাথ সান্যাল মহাশয়কে গুরুজ্ঞানে শ্রদ্ধা ও ভক্তি করতেন এবং নিয়মিত বিভিন্ন বিষয়ে পত্রালাভের মাধ্যমে তাদের দুইজনের মধ্যে যোগাযোগ ছিল।৫
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতৃদেব মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুকালে সান্যাল মহাশয় ভগবৎ কথা শুনিয়েছিলেন।৬
পরবর্তীকালে ১৯০২ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একান্ত অনুরোধে সান্যাল মহাশয় শান্তিনিকেতনের ব্রহ্মচর্যাশ্রমের প্রথম অধ্যক্ষ পদে অধিষ্ঠিত হন।৭
*#পরবর্তীকালে ১৯০৩ হতে ১৯১০ সাল পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যোগাচার্য্য ভূপেন্দ্রনাথ সান্যাল মহাশয়ের নিবিড় সান্নিধ্যে আসেন।৮ (সেই সময়কার বিবরণ শ্রী প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের রচিত ‘রবীন্দ্র জীবনী’ গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে।)
পরবর্তী সময়ে একান্ত ব্যক্তিগত কারণ সান্যাল মহাশয় শান্তিনিকেতনের ব্রহ্মচর্য্যাশ্রমের দায়িত্ব ভার ছেড়ে দেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে আজীবন তাঁর নিবিড় অন্তরঙ্গতা অক্ষুন্ন ছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বহুবার সান্যাল মহাশয়ের গৃহে এসেছেন ও সময়ে বহুক্ষেত্রে অর্থ সাহায্য ও করেছেন। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সান্যাল মহাশয়ের বহু চিঠিতে তা প্রকাশ পায়।৯
*#পরবর্তী সময়ে তাঁরা দুইজনে গোপনে ভারতের বহু তীর্থস্থান ভ্রমণ করেন ও বহু সাধুসঙ্গ করেন। ১৯১২ সালে একবার কাশীর রাণামহল ঘাটে যোগীরাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয়ের অপর এক শিষ্য কৃষ্ণরামজীর আধ্যাত্মিক অনুভূতি ও নির্লোভ অবস্থা দেখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অভিভূত হয়েছিলেন।১০
এই সময় পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রী ভূপেন্দ্রনাথ সান্যাল মহাশয় সাতটি পুস্তক রচনা করেন। প্রত্যেকটি পুস্তক বঙ্গীয় ধার্ম্মিক সাহিত্যে এক অনবদ্য অবদান। তাঁর রচিত শ্রীমদ্ভগবদগীতার (তিন খণ্ড) ভূমিকা রচনা করেন তৎকালীন কাশীর সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক শ্রীযুক্ত মহামহোপাধ্যায় গোপীনাথ কবিরাজ মহাশয় স্বয়ং। সেই ভূমিকাতে স্বয়ং গোপিনাথ কবিরাজ মহাশয় শ্রীযুক্ত সান্যাল মহাশয়ের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
তাঁর রচিত ‘অভ্যাসযোগ’ নামক পুস্তকের প্রাপ্তি স্বীকার করে প্রবাসী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে চিঠি দেন সেখানে তিনি উল্লেখ করেন-
*#এবারকার মেলে আমি দুইখানি বই একসঙ্গে পেলাম একখানি আপনার ‘অভ্যাসযোগ’। দুইখানিই আমার প্রবাসের বন্ধুরূপে দর্শন দিয়াছে। একটিতে আমাদের দেশের সৌন্দর্য আর একটিতে আমাদের দেশের সাধনা আমার সঙ্গ লইয়াছে। উভেয়েতেই আমার প্রয়োজন এবং অনুরাগ।১১
‘দিনচর্য্যা’ পাঠ করে কবিগুরু লেখেন- ‘আপনার দিনচর্য্যা পড়ে উৎসাহ এবং উপকার পেয়েছি। এ বইটি কাজের হয়েছে। এবং এর মধ্যে ভাবের ও অভাব নেই।’১২
*#যোগীরাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয়ের অন্যতম শিষ্য স্বামী যুক্তেশ্বর গিরি মহারাজের দুই শিষ্য পরমহংস যোগানন্দ এবং স্বামী সত্যানন্দ গিরি মহারাজ, নোবেলজয় লাভের কিছুদিন পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ক্রিয়াযোগের কিছু প্রাথমিক পদ্ধতি সম্বন্ধে অবগত হন।১৩
স্বামী সত্যানন্দ গিরি মহারাজের (পূর্বেনাম মনোমোহন মজুমদার) কলেজের বন্ধু ছিলেন প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জোড়াসাঁকোস্থ বাড়িতে বিচিত্রা ক্লাবে প্রভাত বাবুর সহযোগীতায় স্বামী সত্যানন্দ গিরি বহুবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে দেখা করেন এবং অত্যন্ত অন্তরঙ্গভাবে তাঁর সহিত বহু বিষয়ে পরামর্শ করেন। পরবর্তীকালে ১৯২১ সালে স্বামী সত্যানন্দ গিরি মহারাজ কবিগুরুর আমন্ত্রণে শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন। সেই সময় স্বামী সত্যানন্দ গিরি একজন উন্নত ক্রিয়াযোগী জেনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর নিকট হতে কিছু প্রাথমিক ক্রিয়া পদ্ধতি শিক্ষা লাভ করেন এবং স্বামী সত্যানন্দ গিরি মহারাজকে অনুরোধ করেন শান্তিনিকেতনের শিক্ষক হিসাবে যুক্ত হতে। কিন্তু কিছু ব্যক্তিগত কারণ স্বামী সত্যানন্দ গিরি মহারাজ কবিগুরুর সেই অনুরোধ সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেন।১৪
*#পরমহংস যোগানন্দের ভ্রাতা শ্রীযুক্ত শ্রী সনন্দলাল ঘোষ মহাশয় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি দণ্ডায়মান অবস্থার চিত্র অঙ্কন করেছিলেন। কবিগুরু স্বয়ং সেই চিত্র দেখে বিস্ময়ে অভিভূত ও এতটাই সন্তুষ্ট হয়েছিলেন যে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে একখানি প্রশংসাপত্র পাঠিয়েছিলেন শ্রীযুক্ত সনন্দলাল ঘোষ মহাশয়কে। সেখানে তিনি তাঁর দাঁড়ানো ভঙ্গিতে ভালো ছবিগুলির মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলে উল্লেখ করেন। পরবর্তীকালে দিল্লির অ্যাসেমব্লিতে শ্রীযুক্ত সনন্দলাল ঘোষ মহাশয়ের আঁকা ছবিটির অনুকরণে কবিগুরুর একটি মর্মর মূর্তি স্থাপিত হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য শ্রীযুক্ত সনন্দলাল ঘোষ মহাশয় পূজ্যপাদ যুক্তেশ্বর গিরি মহারাজের নিকট ক্রিয়াযোগ প্রাপ্ত হলেও পরবর্তীকালে ক্রিয়াযোগের উচ্চতর সাধন পদ্ধতি লাভ করেন শ্রীশ্রী ভূপেন্দ্রনাথ সান্যাল মহাশয়ের নিকট হতে।১৫
অবশেষে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবন সায়হ্নে এসে ৭৮ বছর বয়সে পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রী ভূপেন্দ্রনাথ সান্যাল মহাশয়ের নিকট ক্রিয়াযোগে দীক্ষা লাভ করেন। সান্যাল মহাশয় কবিগুরুকে আত্মসাক্ষাৎ করিয়ে দেন ও ক্রিয়াযোগের অপরাপর সকল কর্মের (দেহের পবিত্রীকরণ, অঙ্গশোধন ইত্যাদি) মধ্যদিয়ে দীক্ষাদান সম্পন্ন করেন। দীক্ষা গ্রহণকালে কবিগুরু এবং সান্যাল মহাশয়কে সাহায্য করেন পরমহংস যোগানন্দজীর কনিষ্ঠ ভ্রাতা শ্রীযুক্ত বিষ্ণুচরণ ঘোষ মহাশয়ের শিষ্য ও জামাতা বিশিষ্ট ক্রিয়াযোগী বুদ্ধদেব বসু মহাশয়।
*#ক্রিয়াযোগে দীক্ষিত হবার পরই শ্রদ্ধেয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ক্রিয়াযোগী বুদ্ধদেব বসু মহাশয়ের একত্রে একটি ছবি তোলা হয়েছিল তা সংযুক্ত করলাম। সেই সঙ্গে কবিগুরু স্বহস্তে একটি প্রশস্তি পত্রও দিয়েছিলেন বুদ্ধদেব বসু মহাশয়কে।১৬
ক্রিয়াযোগে দীক্ষিত হবার পর আর মাত্র দুই বৎসর তিনি জীবিত ছিলেন। সেই সময় তিনি ভীষণ অসুস্থ ও পীড়াগ্রস্ত থাকলেও নিয়মিত রাত্রির শেষভাগে যোগাভ্যাস করতেন এবং অতি অল্প সময়ে আধ্যাত্ম জগতের অতি উচ্চাবস্থা প্রাপ্ত হন। এই বিষয়ে যোগীবর শ্রী ভূপেন্দ্রনাথ সান্যাল মহাশয় স্বয়ং বলেছেন, ‘সেই সময় কবিগুরু ধ্যানের মধ্যে এতোটাই মগ্ন হয়ে পড়িতেন যে বাহ্য চেতনা পর্যন্ত লুপ্ত হইতো।’১৭
*#বয়সে ছোট হলেও কবিগুরু সান্যাল মহাশয়কে গুরবৎ শ্রদ্ধা ভক্তি করতেন।
✍️ ব্যাখ্যাঃ রতন কর্মকার +8801715982155 (whatsapp)

0 Comments