সকালটা ছিল একদমই সাধারণ। সুকান্ত রায় অফিসে যাবার আগে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিল। হঠাৎই তার মা দোলনাদেবী ঘর থেকে কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে এসে বললেন, “আমি আবারও দেখেছি রে… কালো ছায়াটা… ঠিক তোমার বাবার মাথার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।”
এই প্রথম নয়। এর আগেও বহুবার দোলনাদেবী এই ‘ছায়া’ দেখার কথা বলেছেন। প্রথমে সুকান্ত ভেবেছিল মা’র বয়স হয়েছে, হয়তো কোনো মানসিক বিভ্রান্তি। কিন্তু এখন—এতগুলো লক্ষণ একসঙ্গে এসে যাচ্ছে—সব অসুস্থতা, হালকা কাশি থেকে শুরু করে রাতভর দুঃস্বপ্ন, এমনকি শিশু পূর্ণিমার অকারণে চিৎকার করে ওঠা।
এটা কেবল ‘সম্ভাব্য রোগ’ হতে পারে না।
একদিন রাত্রে হঠাৎ স্ত্রী অরুণা তার ঘুমের মধ্যে শরীর ছটফট করতে করতে বলল, “সুকান্ত! কেউ যেন আমার বুকের ওপর বসে আছে… আমি দম নিতে পারছি না!”
সেই মুহূর্তে ঠিক যেন বাতাস ভারী হয়ে আসে ঘরে। ঘড়ির কাঁটা থেমে যায়, বিদ্যুৎ মিটমিট করে, জানালার কাঁচে যেন কেউ ছায়া আঙ্গুলে ঘষে দিচ্ছে।
সেই রাতেই সুকান্ত তার পুরনো বন্ধু রাকিবকে ফোন করে। রাকিব শোনে, বোঝে, এবং শুধু একটাই কথা বলে,
“তুই নূর ভাইয়ের সঙ্গে দেখা কর… অন্য কেউ পারবে না।”
ঢাকার উপকণ্ঠে একটা পুরনো বাড়ি। বাইরের দিক থেকে দেখলে বোঝা যায় না ভেতরে কেমন রহস্যময় পরিবেশ বিরাজ করছে।
নূর ভাই, এক অদ্ভুত চরিত্র। তিনি ওঝা, মোল্লা, পীর—এমন কিছুই নন। বরং যাকে বলা যায়, ‘আলো-ছায়ার মধ্যবর্তী যাত্রাপথের পথিক।’ মৃত্যুর ছায়া, জীবনের আলো—এই দুইয়ের মাঝে যে রেখা, সেটাকেই তিনি নিজের কর্মক্ষেত্র বানিয়েছেন।
সুকান্ত যখন সব খুলে বলল, নূর ভাই দীর্ঘ সময় চুপ করে রইলেন। যেন চোখ বুঁজে কোনো অলক্ষ শক্তির স্রোতের শব্দ শুনছেন। তারপর ধীরে বললেন, “শুনো, তোমার পরিবারের ওপর শ্মশান-ক্রিয়া যাদু করা হয়েছে। মৃতের আত্মা, পিশাচিক শক্তি—এই সব একত্র করে আত্মীয়দের মধ্যে কেউ এক ভয়ংকর যাদুকারীর সাহায্য নিয়েছে। এই যাদুর প্রভাব সহজে সরে না। এটা রোগ না—এটা অভিশাপ। তোমারা অনেকে এটাকে বলো, বাস্তুদোষ।”
সুকান্ত কাঁপতে কাঁপতে প্রশ্ন করল, “তাহলে আমরা বাঁচব না?”
নূর ভাই গভীরভাবে তাকিয়ে বললেন, “বাঁচতে পারো। কিন্তু তার জন্য তোমায় এবং আমাকে শ্মশানে গিয়ে এই যাদুর মূলকে ধ্বংস করতে হবে। এটা শুধু প্রতিকার নয়—যুদ্ধে নামা।”
নির্বাচিত হলো একটি বিশেষ রাত—অমাবস্যা, সেই সময় যখন মৃতাত্মাদের শক্তি সবচেয়ে প্রবল হয়।
রাজেন্দ্রপুরের পুরাতন একটি শ্মশান। লোকের মুখে রটে, এখানে বহু আত্মা এখনও ঘোরে। অনেকে নাকি এইখানে রাত ১২টার পর পা রাখলে আর ফিরে আসে না।
সেই রাতে সুকান্ত আর নূর ভাই একটি শ্মশান পাশ্ববর্তী পুরনো মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের সামনে গিয়ে বসে। চারপাশে মৃত শীতলতা, কুকুরের ঘেউ ঘেউ আর দূর থেকে শোনা যায় শিয়ালের ডাক। বাতাস ভারী, যেন ছায়ারা হাঁটছে গাছের ডাল ধরে।
নূর ভাই শুরু করলেন মন্ত্রপাঠ। পুরনো ছাই, চিতাভস্ম, একপ্রকার ভেষজ কাঠ ও কিছু অদ্ভুত শব্দে গড়া মন্ত্র ব্যবহার করে তৈরি করলেন এক ‘আস্তর।’ এটি আত্মা ঢোকা ঠেকানোর জন্য।
ঘড়ির কাঁটা রাত ১২টা ছুঁতেই হঠাৎ করেই বাতাস থেমে যায়। রাতজাগা পাখি চুপ হয়ে যায়। একটা সময় আসে, যখন নূর ভাই চিৎকার করে বলেন, “সুকান্ত! কোনো ভয় পাস না। যেটা দেখবি সেটা সত্য, কিন্তু তোর শরীরে ঠাঁই না দিলে কিছুই করতে পারবে না।”
একটা কালো ছায়া ঠিক যেন ধোঁয়ার মতো শূন্য থেকে জন্ম নেয়। তার মুখ নেই, চোখ নেই, কিন্তু আছে চাহনি। সেই ছায়া ঘিরে ধরে তাদের। নূর ভাই তখন উচ্চস্বরে মন্ত্র পড়ছেন—যেটা বাংলা, সংস্কৃত, আরবির এক মিশ্র রূপ। তার চোখে আগুন, শরীর কাঁপছে।
ছায়াটা একসময় মানুষের রূপ নেয়—অর্ধ-জ্বলন্ত শরীর, কুৎসিত চোখ, আগুনে ঝলসানো মুখ, শরীর থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। সেই আত্মা কথা বলে না, কিন্তু তার শরীর থেকে এক শীতল বাতাস বেরিয়ে আসে।
সেই মুহূর্তে হঠাৎ করে চারদিক থেকে ঝড় ওঠে। শ্মশানের গাছগুলো একসঙ্গে দুলে উঠে। মৃতদের কবর থেকে যেন ছায়ারা উঠছে। সুকান্ত থরথরিয়ে কাঁপে।
নূর ভাই তখন এক হাতে ভস্ম, এক হাতে আগুনের প্রদীপ ছুঁড়ে দেন মাঝখানে। তারপর গর্জে উঠে বলেন,
“তোমার সময় ফুরিয়েছে! ফিরে যা মৃত্যুর ঘরে! এই প্রাণ এখন তোদের নয়!”
মন্ত্রের আওয়াজ তীব্র হয়, প্রদীপের আগুন হঠাৎ করে নীল হয়ে যায়।
সেই ছায়া আর আত্মারা ছটফট করতে করতে একে একে উবে যায় বাতাসে। একটা ধ্বংসাত্মা আর্তনাদ করে উঠে—ঠিক যেন কেউ শত বছর পর ঘুম থেকে জেগে উঠে শাপ দিয়ে যায়।
হঠাৎ—একটা আলো ফুটে উঠে শ্মশানের এক কোণে। যেন সকালের সূর্য কিছুটা আগে উঠে এসেছে।
নূর ভাই হঠাৎ থেমে যান। কিন্তু তার মুখে শান্তি। তিনি ফিসফিস করে বলেন, “শেষ হয়ে যায় নি ওরা… তবে আপাতত ওরা গেছে… কিন্তু স্থায়ী ব্যবস্থা না নিলে ওরা আবার ফিরে আসতে পারে…..."
পরদিন সকালে সুকান্ত বাড়ি ফিরে দেখে তার মেয়ে পূর্ণিমা হাসছে, স্ত্রী রুটি বানাচ্ছে, বাবা পত্রিকা পড়ছে—সব যেন এক অলৌকিক স্বাভাবিকতা।
তবে দোলনাদেবী চোখে অশ্রু নিয়ে বলেন, “আমি জানি তুই আমাদের জন্য মৃত্যুর মুখে গেছিস…… বাঁচিয়ে দিলি সবাইকে।”
কয়েকদিন পর খোঁজ পাওয়া যায় এক আত্মীয়র মৃত্যুর। যিনি নাকি এক কুচক্রী তান্ত্রিকের সঙ্গে মিলে সম্পত্তির লোভে এই কালো যাদুর পরিকল্পনা করেছিলেন। মৃত্যু হয়েছিল অদ্ভুতভাবে—ঘুমের ঘোরে স্ট্রোক।
সেইদিন থেকেই সুকান্ত জানে, এই জীবন শুধুই আলোয় নয়—আছে ছায়া। কিন্তু ছায়া যতই প্রবল হোক, নূর ভাইয়ের মতো আলো তার জবাব জানে।
রতন কর্মকার
0 Comments