রোগী vs যোগী
মানবজীবনের দেহ, মন এবং আত্মার মধ্যে আছে গভীর। রোগীর চঞ্চলতা এবং যোগীর স্থিরতার মধ্যে পার্থক্য কেবল শারীরিক নয়, এটি গভীর আধ্যাত্মিক শিক্ষাও বহন করে।
*#রোগীর মন চঞ্চল, যা দেহে রোগের কারণ সৃষ্টি করে। এই চঞ্চলতা আসে বাহ্যিক প্রভাব, অভিজ্ঞতা, এবং মনোবৃত্তির উপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে। রোগী তার মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, বরং মনই তাকে চালিত করে। এই অস্থিরতা তার জীবনীশক্তির (প্রাণশক্তি) সঠিক ব্যবহারে বাধা দেয়।
*#যোগী ধ্যান এবং প্রাণায়ামের মাধ্যমে মনকে স্থির করেন। স্থির মন তাকে বাহ্যিক জগতের পরিবর্তে অন্তর্দৃষ্টিতে মনোনিবেশ করতে সাহায্য করে। এই স্থিরতা দেহ ও মনকে একত্রিত করে এবং এক অখণ্ড চেতনাকে জাগ্রত করে, যা তাকে আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।
মনকে স্থির করা মানে আত্মার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা। চঞ্চল মন ভোগের দিকে টানে, স্থির মন মুক্তির দিকে।
*#রোগীর দেহে তরল পদার্থের (রক্ত, লসিকা) চাপ বৃদ্ধি পায়, যা অনিয়ন্ত্রিত। এই চাপ তার স্নায়ুতন্ত্র এবং দেহযন্ত্রে ব্যাঘাত ঘটায়।উদাহরণস্বরূপ, মানসিক চাপ বা উদ্বেগের কারণে রক্তচাপ বেড়ে যায়, যা দেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে।
*#যোগী তার ইচ্ছাশক্তি দ্বারা এই তরল চাপকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন। এটি কেবল শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখে না, বরং শক্তি চক্র (চক্রব্যবস্থা) সক্রিয় করে। কুণ্ডলিনী শক্তি জাগরণের মাধ্যমে এই তরল চাপ মস্তিষ্কের উচ্চতর কেন্দ্রগুলিতে (সাহস্রার চক্র) পৌঁছায়, যা আত্মজ্ঞান লাভের মাধ্যম।
*#রোগীর ক্ষেত্রে চাপ দেহের ক্ষতি করে; যোগীর ক্ষেত্রে এটি মুক্তি ও উন্নতির পথপ্রদর্শক। তরল চাপ নিয়ন্ত্রণই আত্মার শক্তিকে জাগ্রত করার মূল চাবিকাঠি। রোগীর দেহে তরল চলাচল হয় স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। কিন্তু চঞ্চল মন ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রার কারণে এই প্রবাহ ব্যাহত হয়। উদাহরণস্বরূপ, দেহের বিভিন্ন চক্র (শক্তি কেন্দ্র) সঠিকভাবে সক্রিয় না থাকলে রোগ সৃষ্টি হয়।
*#যোগী প্রাণায়াম ও ধ্যানের মাধ্যমে এই তরল চলাচলকে সুষুম্না নাডির মধ্য দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করেন। সুষুম্না নাডি হল মেরুদণ্ডের মধ্যস্থলে অবস্থিত এক শক্তি চ্যানেল, যা কুণ্ডলিনী শক্তি জাগ্রত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তরল চলাচল সুষুম্না নাড়ির মাধ্যমে হলে এটি আত্মোপলব্ধির পথ উন্মোচন করে।
দেহের তরল চলাচল মানে শুধুমাত্র রক্তপ্রবাহ নয়; এটি প্রানশক্তির প্রবাহ। যোগী এই প্রবাহকে চক্রব্যবস্থার মাধ্যমে জাগ্রত করেন, যা তাকে মুক্তির পথে নিয়ে যায়। রোগী দেহকে শেষ বাস্তবতা বলে মনে করে। তিনি দেহের যন্ত্রণা ও অসুস্থতায় আটকে থাকেন। রোগী বাহ্যিক চিকিৎসার উপর নির্ভরশীল, যা শুধুমাত্র উপসর্গ নির্মূল করে; মূল সমস্যার সমাধান করে না।
যোগী দেহকে আত্মার বাহন বলে বিবেচনা করেন। তিনি বুঝতে পারেন যে দেহ একটি উপায় মাত্র, যার মাধ্যমে আত্মার সাধনা সম্ভব।
যোগী নিজের অন্তর্জগতের শক্তিকে সক্রিয় করার মাধ্যমে রোগমুক্তি ও আত্মোপলব্ধি লাভ করেন। দেহকে বাহন হিসাবে ব্যবহার করতে হলে যোগাভ্যাস অত্যাবশ্যক। বাহ্যিক চিকিৎসা শুধু অস্থায়ী সমাধান দেয়; যোগীর সাধনা চিরস্থায়ী মুক্তি দেয়।
যোগীর ইচ্ছাশক্তি তার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। এই শক্তি তাকে বাহ্যিক জগতের উপরে প্রাধান্য দিতে শেখায় এবং দেহ-মনের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে। ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে যোগী প্রমাণ করেন যে, আত্মা দেহের উপরে এবং দেহের যন্ত্রণা ও অস্থিরতা অতিক্রম করা সম্ভব। ইচ্ছাশক্তি হলো আত্মার প্রকাশ। এটি ব্যবহার করেই মানুষ নিজেকে রোগী থেকে যোগীতে রূপান্তরিত করতে পারে।
*#রোগী_থেকে_যোগীর_পথে_যাত্রা :
রোগীর চঞ্চল মন এবং অস্থির দেহ তাকে দুঃখ ও রোগের দিকে টানে, যেখানে যোগীর স্থিরচিত্ত এবং নিয়ন্ত্রিত জীবন তাকে মুক্তি ও আনন্দের পথে নিয়ে যায়। দেহ-মনের চঞ্চলতা নিয়ন্ত্রণ করে স্থিরতা অর্জন করা সম্ভব। তরল প্রবাহকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারলে দেহ ও আত্মার মধ্যে সমন্বয় স্থাপন হয়। যোগাভ্যাসের মাধ্যমে আমরা বাহ্যিক অবস্থার উপরে প্রাধান্য স্থাপন করতে পারি।
*#অতএব, রোগী ও যোগীর তুলনা কেবল শারীরিক নয়; এটি আধ্যাত্মিক চেতনার উন্মোচন, যেখানে রোগী থেকে যোগীতে রূপান্তর ঘটিয়ে চূড়ান্ত মুক্তি লাভ করা যায়।
✍️ রতন কর্মকার
ক্রিয়াযোগ সম্পর্কে জানতে :
https://youtube.com/channel/UCXMnf7gKAl5SXQ1kivkaY6g?si=I7SFAvm_nvp1QBCE
.jpeg)
0 Comments