আধ্যাত্মিক অনুশীলন ও মহাবিশ্বের সাথে মানবদেহের সম্পর্ক
প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্র, বিশেষত বেদ, উপনিষদ, গীতা, এবং যোগসূত্র আমাদের আধ্যাত্মিক শক্তি, দেহ-মন-আত্মার সংযোগ এবং বৈদ্যুতিক শক্তির মতো ধারণাগুলি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছে।
উদ্ধরেদ আত্মনাত্মানং, নাত্মানমবসাদয়েত।
*#শ্রীমদভগবদগীতা (৬/৫):
এই শ্লোকে বলা হয়েছে, ব্যক্তির আত্মশক্তিই তার মূল চালিকা শক্তি। যখন একজন যোগী বা সাধক আত্মশক্তিতে উন্নীত হন, তখন তাঁর চারপাশে একটি শক্তি ক্ষেত্র তৈরি হয়। এটি সাধারণ মানুষের উপর গভীর প্রভাব ফেলে।
যঃ প্রভাবং সর্বমিদং বিভাতি।
*#উপনিষদ (ছান্দোগ্য উপনিষদ, ৮.৭.১)
এখানে বলা হয়েছে, যিনি আধ্যাত্মিক জ্ঞানে উন্নীত হন, তাঁর শরীর ও মন থেকে প্রভাব বা শক্তি বিকীর্ণ হয়। এটি তাঁর চরিত্র ও ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে অন্যদের অনুভূত হয়।
*#এই আধ্যাত্মিক ধারণাকে আধুনিক বিজ্ঞান বায়োএলেকট্রিক ফিল্ড বলে ব্যাখ্যা করেছে। যোগীদের ধ্যান ও প্রার্থনার মাধ্যমে এই শক্তি চক্র (Energy Field) আরও তীব্র হয়।মাধ্যাকর্ষণ শক্তি কমে যাওয়া আধ্যাত্মিক অগ্রগতির প্রতীক, যা দেহ ও আত্মার মধ্যে মাধ্যাকর্ষণ সম্পর্কের হ্রাসকে নির্দেশ করে।
উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য বরান্নিবোধত।
কঠোপনিষদ (১.৩.৩):
এটি নির্দেশ করে, আধ্যাত্মিক উচ্চতায় পৌঁছানোর জন্য দেহ ও আত্মার মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে হবে। যখন আত্মা পৃথিবীর আকর্ষণ থেকে মুক্ত হয়, তখন আধ্যাত্মিক মুক্তি (মোক্ষ) সম্ভব হয়।
পরং দৃষ্ট্বা নিবর্ততে।
গীতা (২/৫৯):
ইন্দ্রিয় এবং পৃথিবীর আকর্ষণ যখন মনকে আর প্রভাবিত করতে পারে না, তখনই আধ্যাত্মিকতার উচ্চতায় পৌঁছানো যায়।
*#জপ ও ধ্যানের মাধ্যমে সৃষ্ট বিদ্যুৎ-তরঙ্গ শাস্ত্রীয় ভাষায় প্রাণশক্তি এবং চেতনশক্তি নামে পরিচিত।
পতঞ্জলি যোগসূত্র (১/২):
যোগশ্চিত্তবৃত্তিনिरोधঃ।
ধ্যানের মাধ্যমে মন ও চেতনার শক্তি বিকশিত হয়, যা বিদ্যুৎ তরঙ্গের মতো চারদিকে প্রবাহিত হয়।
মুন্ডক উপনিষদ (২.২.১০):
ন তত্র সূর্যো ভাতি, ন চন্দ্রতারকং।
জ্ঞানের আলোক যখন উদ্ভাসিত হয়, তখন সমস্ত বাহ্যিক আকর্ষণ ও অন্ধকার দূর হয়। এই জ্ঞান ধ্যানের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব।
*#ধ্যান করলে মস্তিষ্কের আলফা ওয়েভ এবং গামা ওয়েভ সক্রিয় হয়, যা স্নায়ুতন্ত্রে একধরনের বিদ্যুৎ প্রবাহ সৃষ্টি করে। এটি চারপাশের পরিবেশকেও প্রভাবিত করে।
যোগীর বিদ্যুৎ তরঙ্গের মাধ্যমে দূরদর্শিতার বিষয়টি শাস্ত্রে সিদ্ধি বলে পরিচিত।
যোগসূত্র (৩.১৬):
পরিণামত্রয়সংযমাৎ অতীতানাগতজ্ঞানম্।
ধ্যানের গভীরতায় যোগী অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সবকিছু জানতে পারেন। এটি তাঁর মননের শক্তি এবং সৃষ্ট বিদ্যুৎ-তরঙ্গের মাধ্যমে সম্ভব হয়।
গীতা (১৩.২):
ক্ষেত্রজ্ঞং চাপি মাম বিদ্ধি।
এখানে বলা হয়েছে, যোগী বা জ্ঞানী ব্যক্তি সমস্ত ক্ষেত্র ও জ্ঞানের উৎস সম্পর্কে অবগত হন। তাঁর চেতনশক্তি দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
*#নারদ_মুনি: তিনি মন ও মনের তরঙ্গের মাধ্যমে সমস্ত জ্ঞানের অধিকারী হয়েছিলেন।
*#যোগবশিষ্ঠ: যোগীদের দূরদর্শিতার বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে, যা তাঁদের মননশক্তির কারণে সম্ভব হয়েছে।
শাস্ত্র অনুযায়ী, আত্মা মানবদেহের মূল চালিকাশক্তি। এটি দেহের প্রেরক (Driver) এবং ধারক (Container) উভয়।
কঠোপনিষদ (২.১.১):
আত্মানং রথিনং বিদ্ধি শরীরং রথমেব তু।
আত্মা রথের সারথি এবং দেহ রথ। আত্মাই সমস্ত ক্রিয়াকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে।
গীতা (১৫.৭):
মমৈবাংশো জীবলোকে।
এখানে উল্লেখ করা হয়েছে, আত্মা পরমাত্মার অংশ এবং এটি সমস্ত জীবনশক্তির উৎস।
আধ্যাত্মিক অনুশীলনের মাধ্যমে দেহ ও মনের মধ্যে এক অনন্য শক্তি বিকশিত হয়। এই শক্তি ব্যক্তির চারপাশে একটি প্রভাববলয় (Aura) তৈরি করে, যা অন্যদের দেহ ও মনকে প্রভাবিত করে। আত্মা এবং দেহের বৈদ্যুতিক শক্তির মেলবন্ধনে মানবজীবন পূর্ণতা পায়।
*#আধ্যাত্মিক অনুশীলন কেবল ব্যক্তি উন্নতির জন্য নয়, বরং এটি মহাবিশ্বের সাথে মানবদেহের গভীর সম্পর্ককে চিহ্নিত করে। শাস্ত্র এবং বিজ্ঞান উভয়ই এই সত্যকে সমর্থন করে। আধ্যাত্মিকতার মূল লক্ষ্য হলো আত্মা, মন, এবং দেহের সুষম বিকাশ, যা সমস্ত জীবনের পরম কল্যাণে নিয়োজিত।
✍️ ব্যাখ্যাঃ রতন কর্মকার (whatsapp: +8801811760600)

0 Comments