মৃত্যু-জ্ঞান অর্জন করা
জপ তপ কর কি, মরতে জানলে হয়”—এই বাণীর গভীর আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণ
এই বাণীটি শুধুমাত্র মৃত্যু সংক্রান্ত একটি সাধারণ উপলব্ধি নয়, বরং এটি আত্মজ্ঞান, মুক্তি (মোক্ষ) এবং সাধনার চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিক নির্দেশ করে। এটি বোঝায় যে, শুধুমাত্র জপ-তপ করলেই মুক্তি সম্ভব নয়, বরং মৃত্যুর প্রকৃত অর্থ বুঝতে হবে এবং দেহত্যাগের সঠিক উপায় জানতে হবে। এখন আমরা ধাপে ধাপে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
*#জপ ও তপস্যার উদ্দেশ্য ও সীমাবদ্ধতা :
জপ (মন্ত্রজপ) ও তপস্যা (কঠোর সাধনা) হল সাধকের জন্য অপরিহার্য, কারণ এই দুটি প্রক্রিয়া চিত্তকে শুদ্ধ করে। মন যখন বহির্জগতের আকর্ষণ থেকে মুক্ত হয়ে একাগ্র হয়, তখন ধীরে ধীরে আত্মজ্ঞান উদ্ভাসিত হতে শুরু করে।
ভগবদ্গীতা (৬/১৭)-তে বলা হয়েছে—
"যিনি নিয়ন্ত্রিত আহার-বিহার করেন, নিয়ন্ত্রিত কর্ম করেন, নিয়ন্ত্রিত ঘুমান ও জাগেন, তাঁর যোগসাধনা দুঃখনাশক হয়।"
অর্থাৎ, সঠিক নিয়মে জপ-তপ করলে চিত্ত শান্ত হয় এবং মোক্ষের দিকে এগিয়ে যায়।
যদি কেউ জপ-তপ করেও মনে করে—"আমি জাপক, আমি তপস্বী, আমি অন্যদের চেয়ে উন্নত"—তাহলে সেই জপ-তপ তার জন্য বন্ধনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অহংকার আত্মোন্নতির পথে বড় বাধা। এটি জ্ঞান-বিজ্ঞানকে বাধাগ্রস্ত করে এবং মোক্ষের পরিবর্তে নতুন কর্মবন্ধন সৃষ্টি করে।
শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস বলেছিলেন—
"ঈশ্বরকে পাওয়ার পথে ‘আমি সাধু, আমি বড়’ এই ভাব এলে সাধকের পতন অনিবার্য।"
তাই জপ-তপ তখনই সার্থক, যখন তা দেহাতীত অবস্থায় পৌঁছানোর সহায়ক হয়।
*#মৃত্যু—শুধু এক দেহত্যাগ নয়, বরং মুক্তির দ্বার
ঠোক্করের ক্রিয়া (এই নিয়ে পূর্বে পোস্ট করা হয়েছে) ও যোগাবলম্বনে মৃত্যুর উপায় নিয়ে আলোচনা করা যাক।
এখানে "ঠোক্করের ক্রিয়া" বলতে বোঝানো হয়েছে এক বিশেষ যোগপদ্ধতি, যার মাধ্যমে সাধক ইচ্ছামৃত্যু (স্বেচ্ছামৃত্যু) গ্রহণ করতে সক্ষম হন।
বেদ ও উপনিষদে বলা হয়েছে—
"যিনি যোগের মাধ্যমে প্রাণশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তিনিই প্রকৃত যোগী।"
রঘুবংশীয় রাজারা, যেমন—শ্রী রামচন্দ্র, দাশরথী, অজ, দিলীপ প্রমুখ, এই যোগসাধনা করতেন এবং মহাসমাধির মাধ্যমে দেহত্যাগ করেছেন। মহাকবি কালিদাস তাঁর "রঘুবংশ" মহাকাব্যে বলেছেন—
"যোগেনান্তে তনুত্যজ্যাং"
অর্থাৎ, যোগের মাধ্যমে দেহত্যাগ করাই রাজর্ষিদের স্বাভাবিক পথ
যদি কেউ যোগের মাধ্যমে দেহত্যাগ করতে চায়, তাহলে তার জ্ঞানাগ্নি (আত্মজ্ঞান ও চেতনার শুদ্ধ জ্যোতি) অত্যন্ত তীব্র হওয়া দরকার। কারণ, শুধু ঠোক্করের ক্রিয়া জানা থাকলেই চলে না, বরং চিত্তের সম্পূর্ণ শুদ্ধতা প্রয়োজন। অন্যথায়, সে মৃত্যুতে সাফল্য লাভ করতে পারবে না এবং পুনর্জন্মগ্রহণ করতে বাধ্য হবে।
বৃহদারণ্যক উপনিষদ (৪.৪.১৩)-তে বলা হয়েছে—
"যিনি মৃত্যু ও পুনর্জন্মের চক্র ভেদ করতে পারেন, তিনিই আত্মজ্ঞানী।"
*#ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা—প্রয়াণকালে যোগস্মরণ :
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর ভক্তদের জন্য মৃত্যু সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। গীতায় (৮.১৩) বলা হয়েছে—
"প্রয়াণকালে যোগধারণা অবলম্বনে প্রণবমন্ত্র ব্যবহার পূর্ব্বক আমাকে স্মরণ করিলেই দেহত্যাগান্তে পরা গতি লাভ হয়।"
অর্থাৎ, মৃত্যু যদি নিয়ন্ত্রিত ও যোগসিদ্ধ হয়, তবে পুনর্জন্মের চক্র থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। তাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর ভক্ত, সখা ও শিষ্য অর্জুনকে এই গোপন উপদেশ দিয়েছিলেন।
শ্রীকৃষ্ণ গীতায় আরও বলেছেন—
"ন মে ভক্তঃ প্রণশ্যতি" (গীতা ৯.৩১)
অর্থাৎ, আমার ভক্ত কখনো বিনষ্ট হয় না।
এর মানে হল, ভক্ত যদি মৃত্যুর সময়ও তাঁকে স্মরণ করে, তাহলে সে অবশ্যই মোক্ষ পাবে।
মোক্ষলাভের সঠিক পদ্ধতি এবং যেভাবে মৃত্যুকে আয়ত্ত করা যায় :
মৃত্যুর সময় যদি মন ভগবানে কেন্দ্রীভূত থাকে, তবে জীব দেহত্যাগের পর পুনর্জন্মগ্রহণ করে না। গীতায় (৮.৬) বলা হয়েছে—
"যে যে ভাব নিয়ে দেহত্যাগ করে, সে সেই ভাব অনুযায়ী পরবর্তী জন্ম লাভ করে।"
তাই জীবনের শেষ মুহূর্তে যদি কেউ শ্রীকৃষ্ণ বা পরম ব্রহ্মের স্মরণে থাকে, তবে সে ব্রহ্মলোক বা বৈকুণ্ঠে গমন করে।
*#সাধকের জন্য প্রস্তুতি—তিনটি ধাপ :
১. জপ-তপ ও সাধনার মাধ্যমে চিত্ত শুদ্ধ করা
২. ঠোক্করের ক্রিয়া ও যোগসাধনার মাধ্যমে দেহত্যাগের প্রস্তুতি নেওয়া
৩. ভগবানের শরণ গ্রহণ করে মৃত্যুর মুহূর্তে তাঁকে স্মরণ করা
যে ব্যক্তি এই তিনটি ধাপ অনুসরণ করতে সক্ষম হয়, সে পুনর্জন্মের চক্র থেকে মুক্ত হয়ে চিরমুক্তি লাভ করে।
*#তাই, শুধুমাত্র জপ-তপ করলেই মুক্তি সম্ভব নয়, যদি না দেহত্যাগের যোগ্যতা অর্জিত হয়।
ঠোক্করের ক্রিয়া ও যোগসাধনার মাধ্যমে দেহত্যাগ করলে, স্বাধীনভাবে মৃত্যু গ্রহণ করা যায়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলেছেন, মৃত্যুর সময় তাঁকে স্মরণ করলে মোক্ষ অনিবার্য।
অহংকার মুক্ত চিত্ত নিয়ে, গুরু-অনুগ্রহে ও শ্রীকৃষ্ণের শরণে গেলেই পরমগতি সম্ভব।
*#মৃত্যু শুধুমাত্র একটি জীবনের শেষ নয়, বরং এটি মোক্ষের দরজা। সঠিকভাবে মৃত্যুকে আয়ত্ত করতে পারলেই চিরমুক্তি সম্ভব। তাই জপ-তপের পাশাপাশি মৃত্যু-জ্ঞান অর্জন করাই প্রকৃত সাধনার উদ্দেশ্য।
✍️ ব্যাখ্যাঃ রতন কর্মকার +8801715982155 (whatsapp)
.jpeg)
0 Comments