Recent Posts

6/recent/ticker-posts

যোগীরাজ বাণীঃ "ক্রিয়া করিবার দিক, দেশ ও কালের কোন নিয়ম নাই।"

 



যোগীরাজ বাণীঃ "ক্রিয়া করিবার দিক, দেশ ও কালের কোন নিয়ম নাই।"

যোগীরাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয়ের এই বাণীটি সাধনার সার্বজনীনতা, সময়ের ঊর্ধ্বে থাকা যোগপদ্ধতি, শুদ্ধ চৈতন্য লাভ এবং মুক্তির সহজ পথ সম্পর্কে গভীর তত্ত্ব প্রকাশ করে। শ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয় নিজে সংসারী হয়েও মহাযোগী ছিলেন এবং দেখিয়েছেন যে আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য কোনো নির্দিষ্ট স্থান, কাল বা পরিস্থিতির প্রয়োজন নেই। ক্রিয়াযোগ এমন এক পদ্ধতি, যা সমস্ত ধর্ম, জাতি, দেশ, সময় ও শর্তের ঊর্ধ্বে থেকে মানুষকে তার প্রকৃত স্বরূপের দিকে নিয়ে যায়।

ক্রিয়াযোগ এমন এক প্রাণচেতনার বিজ্ঞান, যা চেতনার পরিসরকে সম্প্রসারিত করে। এটি নির্দিষ্ট কোনো ধর্ম বা সম্প্রদায়ের জন্য সীমাবদ্ধ নয়, বরং যে কোনো মানুষ, যে কোনো পরিস্থিতিতে, যে কোনো সময়ে এই সাধনা করতে পারেন।

*#স্থান বা পরিবেশের সীমাবদ্ধতা নেইঃ

সাধারণত ভাবা হয় যে, ধ্যান বা সাধনার জন্য নির্জন পরিবেশ, গুহা, মঠ, মন্দির বা আশ্রম প্রয়োজন। কিন্তু ক্রিয়াযোগের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট জায়গা বাধ্যতামূলক নয়। গৃহস্থ, কর্মস্থল, চলার পথে বা ট্রেনের মধ্যে বসেও ক্রিয়াযোগ করা সম্ভব। কারণ এটি চেতনার অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া, বাহ্যিক পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল নয়। একজন যোগী যে কোনো জায়গায়, যে কোনো মুহূর্তে নিজেকে শ্বাস, প্রাণ ও মন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ধ্যানে স্থাপন করতে পারেন।

*#সময়ের কোনো বাধ্যবাধকতা নেইঃ

বেশিরভাগ আধ্যাত্মিক সাধনায় নির্দিষ্ট সময়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়, যেমন ভোরে ব্রাহ্মমুহূর্তে ধ্যান, সন্ধ্যায় উপাসনা ইত্যাদি। কিন্তু ক্রিয়াযোগ যেকোনো সময় করা যায়—ভোর, দুপুর, সন্ধ্যা, মধ্যরাত, এমনকি ব্যস্ততার মধ্যেও। যদিও উপরিউক্ত সময়ে করা উত্তম। তবে পরিস্থিতি অনুযায়ী সময়ের পরিবর্তন করা যায়। কারণ এটি শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে সুষম করে মস্তিষ্ক ও চেতনায় সরাসরি প্রভাব ফেলে। সাধকের চেতনার অবস্থা গুরুত্বপূর্ণ, সময় নয়।

*#ধর্ম, জাতি, লিঙ্গ, বয়স বা সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বেঃ

অন্যান্য ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক অনুশীলনে জাতি, লিঙ্গ, সম্প্রদায় বা ধর্মের প্রভাব থাকতে পারে।

কিন্তু ক্রিয়াযোগ সম্পূর্ণ বিজ্ঞানভিত্তিক ও সার্বজনীন। যে কেউ—হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ—এই যোগপদ্ধতি অভ্যাস করতে পারেন। পুরুষ, নারী, শিশু, বৃদ্ধ—সবার জন্য উপযুক্ত।

*#শ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়ন্ত্রণ ও প্রাণশক্তির সঞ্চালনঃ

প্রাণশক্তি (life force) শ্বাসের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত। সাধারণ মানুষের শ্বাস অস্থির হয়, ফলে মনও অস্থির থাকে। ক্রিয়াযোগের মাধ্যমে শ্বাস ধীর করে মনকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এতে মনের গতিশীলতা কমে গিয়ে গভীর ধ্যানের অভিজ্ঞতা হয়।

*#কুন্ডলিনী শক্তির জাগরণঃ

ক্রিয়াযোগ মেরুদণ্ডের সাতটি চক্রের ওপর কাজ করে। প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে প্রাণশক্তি মেরুদণ্ডের মধ্য দিয়ে ওঠানামা করে।ধীরে ধীরে কুন্ডলিনী শক্তি জাগ্রত হয়, এবং সাধকের চেতনা উন্নততর স্তরে পৌঁছায়।

*#চেতনার বিস্তার ও মোক্ষের অভিজ্ঞতাঃ

শ্বাসের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মন একাগ্র হয় এবং মনের অশান্তি দূর হয়। ক্রিয়াযোগের সাহায্যে সাধক ধীরে ধীরে সমাধিস্থ অবস্থা অর্জন করেন। একসময় চেতনা শূন্যমহাশূন্যে প্রবেশ করে, যা আত্মসাক্ষাতের চূড়ান্ত স্তর।

*#সংসারধর্ম ও ক্রিয়াযোগ—লাহিড়ী মহাশয়ের বিশেষ শিক্ষাঃ

লাহিড়ী মহাশয় নিজে সংসারধর্ম পালন করেও চরম আত্মসাক্ষাৎ লাভ করেছিলেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে গৃহী জীবনযাত্রার মাঝেও ক্রিয়াযোগ চর্চার মাধ্যমে মোক্ষলাভ সম্ভব। তিনি তাঁর শিষ্যদের সংসার না ছাড়তে বলেছেন, বরং সংসার করেই সাধনা করতে বলেছেন। পূর্বে মনে করা হতো যে মোক্ষলাভের জন্য সংসার ত্যাগ করা আবশ্যক। কিন্তু লাহিড়ী মহাশয় বলেছেন, সংসারেই পরম মুক্তি সম্ভব।

তাঁর এই শিক্ষা বর্তমান যুগের মানুষদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

-#কাজের ফাঁকেও ক্রিয়াযোগ সম্ভবঃ

কর্মব্যস্ত মানুষেরা অফিসের ডেস্কে বসেও ক্রিয়া অনুশীলন করতে পারেন। (এক্ষেত্রে গুরুদেব নির্দেশিত সূক্ষ্মক্রিয়ার কথা বলা হচ্ছে।) স্বল্প সময়ের জন্য করলেও ক্রিয়াযোগ গভীর প্রভাব ফেলে। এতে ব্যক্তিত্ব উন্নত হয়, মানসিক প্রশান্তি আসে এবং কর্মে দক্ষতা বাড়ে।

*#লাহিড়ী মহাশয়ের এই বাণী শুধুমাত্র একটি আধ্যাত্মিক উক্তি নয়, বরং সত্যসন্ধানীদের জন্য মুক্তির এক শাশ্বত মন্ত্র।

অতএব, ক্রিয়াযোগ সর্বত্র, সর্বদা, সবার জন্য প্রযোজ্য। এটি ধর্ম, জাতি, স্থান, কাল, লিঙ্গের ঊর্ধ্বে। অফিসে, বাড়িতে, পথে, পাহাড়ে—যে কোনো জায়গায় করা যায়। ভোর, দুপুর, সন্ধ্যা—যে কোনো সময় অভ্যাস করা যায়। সংসার ও সাধনা একসঙ্গে সম্ভব। এই যুগের জন্য সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর মোক্ষের পথ। যারা আত্মসন্ধানী, তারা এই বাণীর গভীরতা উপলব্ধি করে ক্রিয়াযোগের মাধ্যমে আত্মসাক্ষাতের পথে এগিয়ে যেতে পারেন।

*#তাৎপর্য_ব্যাখ্যাঃ রতন কর্মকার

(whatsapp: +8801811760600)

Post a Comment

0 Comments