Recent Posts

6/recent/ticker-posts

পরমধাম

 



পরমধাম

"যেখানে গেলে আমাকে আর ফিরে আসতে হবে না, সেই আমার পরমধাম।"  

(*#যোগাচার্য্য_সেবকানন্দ_মহারাজ)


যে পদ সূর্য্য প্রকাশ করতে পারেন না, অগ্নি ও প্রকাশ করতে পারেন না, চন্দ্ৰ ও পারেন না; যোগীগণ যে পদ পেয়ে সংসারে পুনঃপ্রত্যাবর্তন করেন না, সেটিই 'পরমধাম'।


*#সেই স্থান এমনই অদ্ভূত যে আকাশে বিদ্যমান মহান সূর্য তাঁর জ্যোতি সমষ্টি দিয়েও তৎপদকে আপন জ্যোতিতে প্রকাশ করতে পারেন না, চন্দ্র তাঁর স্নিগ্ধতা দিয়েও পারেন না, অগ্নিও তাঁর দীপ্তি ও দাহিকা শক্তি দিয়ে পারেন না; কারণ সূর্য, চন্দ্র, অগ্নি এই তিনের কেউই তৎপদে পৌঁছবার শক্তি রাখেন না। কিন্তু বিষ্ণুর পরম ধাম আপন তেজ প্রভাবে ঐ তিনটিকে প্রকাশ করে থাকেন। তাই তদ্ববিষ্ণুর পরমপদকে প্রাপ্ত হলে আর সংসারে পুনরাবৃত্তি থাকে না। এই পদ 'আমি'র পরমধাম বা বিশ্রামস্থান। যোগীরাজ শ্রীশ্রী লাহিড়ী মহাশয় বলেছেন - সে বড় এক আশ্চর্য জায়গা - যা ক্রিয়ান্বিত ব্যক্তিরা অনেকেই দেখছেন যা গুরুবক্তগম্য। কিন্তু না জানার দরুন লোক এই বিষয়ে শুনলে পরিহাস করবে – সূর্যের কিরণ সেখানে নাই-চন্দ্রের রশ্মি ও নাই-অগ্নির দীপ্তি ও নাই- যেখানে গেলে কেউ ফেরেনা – সেই আমার পরমধাম অর্থাৎ ক্রিয়ার পরাঅবস্থা।


*#সেই জায়গা আশ্চর্যজনক স্থান সন্দেহ নেই; কারণ কাশী হরিদ্বার প্রভৃতি তীর্থ স্থানের মত তা স্থানবিশেষ নয়। জীব স্বরূপতঃ ব্রহ্মই। কিন্তু প্রকৃতির প্রেরণায় জীব সর্বদা কর্মচক্রে ঘুরতে থাকে তার ফলে নানা যোনিতে জন্মগ্রহণ করে। কাজেই ইচ্ছা না থাকলেও জীব প্রকৃতি বশে জন্ম-মৃত্যুর চক্রে বার বার ঘুরতে থাকে। ভগবান বা পরমাত্মা বা ব্রহ্ম সকল অবস্থাতেই প্রকৃতির অধীশ্বর। তিনি প্রকৃতির অধীন নন। জীব সেই পরমাত্মারই অংশ। জীব বদ্ধ বলেই তার মুক্ত হবার ইচ্ছা স্বাভাবিক। যতদিন জীব পরমাত্মা থেকে নিজেকে আলাদা দেখে ততদিনই সে বদ্ধ। যখন সে জ্ঞান লাভ করে স্বীয় স্বরূপ জানতে পারে তখন সে প্রকৃতি পরতন্ত্রতার থেকে মুক্ত হয়। বদ্ধজীব মায়ার খেলায় মেতে থাকে। মায়াই আবার বিষ্ণু শক্তি । সেই শক্তির শরণ গ্রহণ করলেই জীব মৃত্যুরূপ সংসার থেকে উত্তীর্ণ হয়। বিষ্ণু মায়া ও বিষ্ণু শক্তি একই কথা। তাই বিষ্ণু ও মায়া অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। বিষ্ণু ও মায়া যথাক্রমে নারায়ণ ও নারায়ণী, তন্ত্রে একেই মহামায়া বলা হয়েছে, বেদ একে মুখ্য প্রাণ আর যোগীরা একে স্থির প্রাণ বলেছেন। মায়ার কার্য এই দেহ। দেহকে অবলম্বন করেই জীবের যাতায়াত - এটিই মায়ার খেলা। মনুষ্য দেহকে জীব সঠিকভাবে জানতে পারলেই মুক্ত হয়ে যাবে। প্রাণের চঞ্চল গতির জন্যই মন উন্মত্তের মত সংসার চক্রে ঘুরে বেড়ায়। প্রাণের গতি হলেই মন উন্মত্তভাবে মায়ার খেলায় আসা-যাওয়া করে। একে রোধ করার একমাত্র উপায় - প্রাণকে স্থির করা। যোগীরা প্রাণকে ক্রমাগত সুষুম্না মার্গে পরিচালনা করে মোক্ষলাভ করে থাকেন। মানুষের মন বিশ্বাত্বক হলেই জ্ঞানের উদয় হয়। সুষুম্নায় প্রবেশ করলেই মন বিশ্বাত্বক হয়। তখন অন্য সব কিছু স্বপ্নের মত মনে হয়। মন প্রকাশশালী, কামনাবিহীন, মন্ত্রসিদ্ধ ও সর্বশক্তি সম্পন্ন হয়। প্রাণায়ামাদি যোগক্রিয়া অভ্যাসের ফলে মনের বাহ্য সংকল্প রুদ্ধ হয়ে ক্রিয়ার পরাবস্থায় স্থিতি লাভ করে ঈশ্বর ভাব লাভ হয়। ঈশ্বর সকলের হৃদয়দেহে সর্বদা বিরাজ করেন।


*#দেহমধ্যস্থিত সেই ঈশ্বরকে জানার উপায় হ'ল - মুলাধারাদি পঞ্চচক্রভেদ করে মেরুদণ্ড মধ্যস্থিত সুষুম্না নাড়ীর মধ্যে যে ব্রহ্ম নাড়ী আছে এবং তার অন্তর্গত ব্রহ্মাকাশ আছে - তাই সর্বশক্তিসম্পন্ন ঈশ্বর। তাঁরই শাসনে পঞ্চতত্ত্ব, মন ও ইন্দ্রিয়াদি নিজ নিজ কর্ম করে থাকে। তাঁর নির্দেশে অগ্নি, বায়ু, ইন্দ্র ও মৃত্যু নিজ নিজ কর্ম করে চলেছে। অর্থাৎ প্রাণশক্তির শাসনে ক্ষিতি, অপ, তেজঃ মরুৎ ব্যোমাদি নিজ নিজ কার্য্যে নিযুক্ত রয়েছে। মহাপ্রাণ বা ব্রহ্মাকাশ সর্বত্র বিরাজমান হলেও প্রধানতঃ আজ্ঞাচক্র বা কূটস্থেইবিশেষ কার্য প্রকাশিত ।


*#তাই আজ্ঞাচক্রে লক্ষ্য রাখলেই সমস্ত চক্রস্থ কূটস্থের প্রতি লক্ষ্য করা যায়। আজ্ঞাচক্রস্থ কূটস্থেলক্ষ্য রাখতে পরলেই ব্রহ্মনাড়ী দিয়ে গমনাগমন করলেই সর্বতোভাবে তাঁর শরণ নেওয়া হয়। তখন তার মনরূপ উপাধি দেশ কালাদির ব্যবধান, ভিন্ন ভিন্ন বস্তুর ধারনাদি সব চলে যায় এবং জীব স্বস্বরূপ অবস্থান করে। আর সেটাই ব্রহ্মধর্ম। তাই জীবের পক্ষে সেই স্থান বড়ই আশ্চর্য জনক। দেহকেই আত্মা বোধ করে মন এই বিরাট সংসারকে গড়ে তুলেছে এবং নিজেকে শত বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। এই সম্বন্ধ কখনও যাবে বলে ভাবাও যায় না। এই বিবিধ সম্বন্ধযুক্ত জগৎ ক্রিয়ার পরাবস্থায় অন্তঃকরণ নিরুদ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের প্রকাশও নিরুদ্ধ হয়ে যায়। তখন অন্তঃকরণ বৃত্তি দ্বারা যা কিছু ভিন্ন ভিন্ন বলে মনে হচ্ছিল তা সব বিলীন হয়ে যায় এবং তার প্রকৃত স্বরূপ প্রকাশ পায়। তখন যা প্রকৃত বাস্তবিক তাই বোধহয়। এই অবস্থাকে বিষ্ণুর পরমপদ বলা হয়। এই অবস্থা একবার লাভ হলে আর তা থেকে বিচ্যুত হতে হয় না। তখন যোগীরা সর্বদা জাগ্রত থাকেন। সেই অবস্থাটা ইড়া পিঙ্গলা ও সুষুম্নার অতীত অবস্থা। সেখানে আলো নেই, অন্ধকার নেই, চন্দ্র- সূর্য নেই, অগ্নিও নেই অথচ স্বপ্রকাশ। সেখানে কুটস্থের নক্ষত্ররূপ গুহাতে ক্রিয়া অভ্যাসের দ্বারা গমন করা যায়। সেখানে অন্তহীন আকাশে ওঁকার ধ্বনি শোনা যায়। যাঁরা নিয়মিত সুদীর্ঘক্ষণ ধরে ক্রিয়া করেন তাঁরাই এই আনন্দময় স্থানে যেতে পারেন। প্রথমে প্রাণায়াম দ্বারা অনিল স্থির হয়, সেই স্থিতিই অনিলানন্দ, বা অমৃতপদ বা ক্রিয়ার পরাবস্থা। তখন সাধকও সেই আনন্দময়ের সঙ্গে এক হয়ে যায়। ক্রিয়ার পরাবস্থাতে এই আনন্দ অনুভব হয়। তাঁকে না জানতে পারলেই অনেক দূরে বলে মনে হয়। যে ক্রিয়া করে ক্রিয়ার পরাবস্থা অনুভব করে সে অনুভব করে যে সেই অনুভবেই সব এক হয়ে আছে। তিনি সকলের মধ্যে এবং সকলের অন্তরে বাইরে এক। তিনি ছাড়া কেউ নাই, কিছু নাই। সুতরাং বোঝা গেল যে ক্রিয়ার পরাবস্থাই আমার পরমধাম।


🙏জয়গুরু🙏

✍️ ব্যাখ্যাঃ রতন কর্মকার +8801715982155 (whatsapp)

Post a Comment

0 Comments