শিব, কুণ্ডলিনী এবং যোগসাধনার গভীর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
শিবের গলায়, কোমরে ও মাথার উপর নাগসাপ দেখা যায়। এটি শুধুমাত্র পৌরাণিক বা প্রতীকী বিষয় নয়, বরং সাধনার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শিবের গলায় থাকা নাগসাপ প্রতীকীভাবে বোঝায়—
*#নিয়ন্ত্রণ: কণ্ঠের কাছে এটি অবস্থান করে, যা বোঝায় যে শিব তাঁর সমস্ত শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন।
*#বিষগ্রহণ: সমুদ্র মন্থনে যখন হলাহল বিষ নির্গত হয়েছিল, শিব তা পান করেছিলেন, কিন্তু তা গলাতেই ধারণ করেছিলেন। সাধকের জন্য এটি একটি শিক্ষা— সংসারের দুঃখ, কষ্ট ও প্রতিকূলতা নিতে হবে, কিন্তু তাকে হৃদয়ে প্রবেশ করতে দেওয়া যাবে না।
*#শ্বাস-প্রশ্বাস ও চেতনা: যোগশাস্ত্রে বলা হয়, দীর্ঘ শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে মনকে শান্ত করা যায়। শিবের গলায় থাকা সাপ বোঝায়, শ্বাসনিয়ন্ত্রণ ও ধ্যানের মাধ্যমে উচ্চতর চেতনাতে পৌঁছানো সম্ভব।
*#কোমর বা মূলাধার চক্র হল সেই স্থান যেখানে কুণ্ডলিনী শক্তি সুপ্ত অবস্থায় থাকে।
এটি বোঝায় যে শিব হলেন সমস্ত শক্তির উৎস, এবং সমস্ত শক্তি তিনিই ধারণ করেন। সাধক যখন কুণ্ডলিনী জাগরণ করেন, তখন এটি মূলাধার থেকে সুষুম্না দিয়ে ঊর্ধ্বগামী হয়। এটি কুণ্ডলিনীর চূড়ান্ত উত্থান বোঝায়, যখন শক্তি সহস্রার চক্রে পৌঁছে যায়। তখন জীবাত্মা ও পরমাত্মার মিলন ঘটে, যা শিবসত্তার প্রতীক।
*#যোগশাস্ত্রে বলা হয়, মানবদেহে তিনটি প্রধান নাড়ি রয়েছে—
*#ইড়া নাড়ি (বামদিকের চন্দ্রনাড়ি – শীতলতা ও মানসিক শক্তি)
*#পিঙ্গলা নাড়ি (ডানদিকের সূর্যনাড়ি – উত্তাপ ও কর্মশক্তি)
*#সুষুম্না নাড়ি (মধ্যবর্তী নাড়ি – যেখানে কুণ্ডলিনী শক্তি ঊর্ধ্বগামী হয়)
সাধারণ অবস্থায় কুণ্ডলিনী শক্তি মূলাধারে কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকে। এটি দুই-মুখী সাপের মতো, যার নিচের মুখ বড় এবং উপরের মুখ ছোট। অজ্ঞান জীবের ক্ষেত্রে সাপের মুখ নিচের দিকে থাকে, অর্থাৎ শক্তি পার্থিব বিষয়ে আসক্ত থাকে। সাধনার মাধ্যমে: যখন কেউ যোগ ও ধ্যানচর্চা করে, তখন কুণ্ডলিনী শক্তি জাগ্রত হয়ে সুষুম্না নাড়ির মধ্য দিয়ে উপরে উঠে সহস্রার চক্রে পৌঁছে যায়।
তখনই জীবশিব ঈশানরূপে প্রকাশিত হয়। সাতটি চক্র আসলে শিবের বাসস্থান। যখন কুণ্ডলিনী শক্তি সাতটি চক্র ভেদ করে, তখন শিবত্ব লাভ হয়।
যোগে তিনটি শক্ত বাধা বা গ্রন্থি রয়েছে—
*#ব্রহ্মগ্রন্থি (মূলাধার ও স্বাধিষ্ঠানে অবস্থিত)
এটি পার্থিব আকর্ষণ বোঝায়। যখন শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করে শক্তিকে মূলাধার থেকে নাভিকুণ্ড পর্যন্ত আনা যায়, তখন এটি ভেদ হয়।
*#বিষ্ণুগ্রন্থি (অনাহত ও বিশুদ্ধের মাঝে অবস্থিত) এটি ইন্দ্রিয়বোধের বন্ধন বোঝায়।
যখন শ্বাসবায়ু বিশুদ্ধচক্র পর্যন্ত ওঠে, তখন এটি ভেদ হয়।
*#রুদ্রগ্রন্থি (আজ্ঞা চক্রে অবস্থিত) এটি জীবাতীত অবস্থার প্রতীক। এটি ভেদ করলে জীবগণনা, সময় ও মৃত্যুর সীমা অতিক্রম করা যায়।
*#নাগসাপ আসলে শিবের প্রতীক মহাকাল।
এটি কাম ও আকর্ষণের প্রতীক, কারণ কামনাই জীবকে আবদ্ধ রাখে। কিন্তু যখন শ্বাসবায়ুকে কৌশলে নিয়ন্ত্রণ করে কুণ্ডলিনীকে ঊর্ধ্বমুখী করা যায়, তখন পার্থিব আকর্ষণ দূর হয়। তখন জীব শূন্যতার আস্বাদন করে, যা নিরঞ্জন শিবস্বরূপ।
*#কুণ্ডলিনী শক্তি যখন সহস্রারে পৌঁছায়, তখন জীব শিবত্ব লাভ করে। তখন সমস্ত পার্থিব আকর্ষণ থেকে মুক্তি ঘটে। নিত্য ধ্রুব অনাহত ধ্বনি তখন দ্রুত হতে থাকে, যা চেতনার সর্বোচ্চ স্তর। এই অবস্থায়— মায়া ও মোহ থেকে মুক্তি ঘটে, কামনা দূর হয়, শিবসত্তা উপলব্ধি হয় এবং এটাই শিবসাধনার চূড়ান্ত লক্ষ্য।
শিবের গলায়, কোমরে ও মাথার নাগসাপ শুধুমাত্র অলংকার নয়, বরং এটি গভীর আধ্যাত্মিক প্রতীক। কুণ্ডলিনী শক্তি যখন জাগ্রত হয়, তখন সাতটি চক্র পার হয়ে শিবত্ব অর্জিত হয়। তিনটি গ্রন্থি ভেদ করলে জীবাতীত চেতনার অভিজ্ঞতা ঘটে। শ্বাসনিয়ন্ত্রণ ও ধ্যানের মাধ্যমে এটি সাধন সম্ভব। এই পুরো আলোচনা বোঝায়, শিবসাধনার প্রকৃত রূপ কুণ্ডলিনী শক্তিকে জাগ্রত করে জীব শিবত্বের স্তরে পৌঁছে যেতে পারে।
✍️ রতন কর্মকার

0 Comments