Recent Posts

6/recent/ticker-posts

আন্তর্জাতিক নারী দিবস ও সনাতন ধর্মে মাতৃপূজা


 


আন্তর্জাতিক নারী দিবস ও সনাতন ধর্মে মাতৃপূজা "!

---------------------------------------------------------------------------

( আর্ন্তজাতিক নারী দিবস উপলক্ষ্যে হিন্দু ধর্মে নারী তথা দেবীর স্থান নিয়ে আমার এই লেখা ৷

আমার লেখা "হিন্দু ধর্ম " ও "সনাতনী কৃষ্টিকথা " বইদুটিতে এমন অনেক লেখা সহ হিন্দু ধর্মের ঐতিহ্য , দেবদেবী ,ধর্মগ্রন্থ ইত্যাদি বিস্তারিত লিখেছি  ৷ এছাড়া আমার "মন" বইটিতে  নারীর মন নিয়ে এবং "রোগ পরিচয় " বইটিতে মহিলাদের বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা নিয়ে বিশদে লিখেছি ৷ প্রয়োজনে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে বইগুলির দাম ফোন পে করে ক্যুরিয়ার বা স্পিড পোস্টে সংগ্রহ করতে পারেন ৷) 

       যেকোন প্রাণীর সবচেয়ে আপনজন তার মা ৷ যিনি বাচ্চাকে পেটের ভিতর ও বাইরে বর্ধন করেন , প্রথমে বুকের দুধ দিয়ে তারপর আহার যুগিয়ে পালন ও পোষণ করেন ৷ তাই , সৃষ্টির আদি লগ্ন থেকে মানুষ জগতের পালনকারী হিসাবে মাতৃ রূপের পূজা করে এসেছে ৷ যদিও অধিকাংশ ধর্মে ঈশ্বরকে সৃষ্টিকর্তা বা পুরুষ বলে এসেছে ৷ মানুষ ঈশ্বরের কল্পনার সাথে সাথেই তিনি পুরুষ না নারী এই বির্তকে যোগ দিয়েছে ৷ সমাজ বিবর্তনের প্রারম্ভ থেকে মানবী মা হয়ে উঠেছিলেন শস্যদায়িনী তথা ধরিত্রী মাতা ৷ প্রাচীন গ্রীসে রহী , এশিয়া মাইনরে সিবিলি ,সুমেরিয়াতে তাম্বুজ , মিশরে ইস্তার ও আইসিস  প্রভৃতি দেবীর পূজা প্রচলিত ছিল ৷ বৈদিক যুগে সরস্বতী , ঊষা , অদিতি , পৃথ্বি প্রভৃতি মাতৃ আরাধনার প্রমাণ পাই ৷  পরে পরে আসে দুর্গা , অম্বা , কাত্যায়নী , শ্রী , কালী , কন্যাকুমারী ইত্যাদি দেবীর পূজা ৷ আসলে পুরুষ ও প্রকৃতি মিলেই তো সৃষ্টি ৷ পুরুষ ঈশ্বর যদি সৃষ্টির মূলে হন তবে শক্তি বা জগন্মাতা করেছেন সৃষ্টির বিকাশ সাধন ৷ ব্রহ্ম নিষ্ক্রিয় হলেও শক্তি সবসময় সক্রিয় ৷ শক্তির সক্রিয়তা ভিন্ন ব্রহ্মের কার্যকারিতা কোথায় ? তাই শবারূঢ়া দেবী হয়েছেন শিবারূঢ়া ৷ তাই ,হয়েছে ঈশ মাতৃকার বিকাশ নানা দেশে সেই পুরাকাল থেকে ৷

    আসি ভারতবর্ষের কথায় ৷ পঞ্জাবের হরপ্পা কিংবা সিন্ধু প্রদেশের মহেঞ্জোদারোতে অনেক পোড়ামাটির  দেবী মূর্তি পাওয়া গেছে ৷ অনেকের মতে তা ছিল সেখানকার মূল আরাধ্যা ৷ বৈদিক যুগে ঋগ্বেদের দেবীসূক্ত ও রাত্রিসূক্ত এবং সামবেদের রাত্রিসূক্ততে  শক্তি বা মাতৃপূজার কথা পাই ৷ অষ্টমন্ত্রাত্মক দেবীসূক্তের ঋষি ছিলেন অম্ভৃণ মুনির ব্রহ্মবাদিনী মেয়ে বাক্ ৷ যিনি ব্রহ্মশক্তিকে নিজের আত্মারূপে অনুভব করে বলেছিলেন ,"আমিই ব্রহ্মময়ী আদ্যাশক্তি ও বিশ্বেশ্বরী "৷ কুশিক মুনি ঋগ্বেদের রাত্রিসূক্তের মন্ত্রদ্রষ্টা ৷ যাতে ভূবনেশ্বরী দেবীর মন্ত্র পাই ৷ ঋগ্বেদে বিশ্বদুর্গা , অগ্নিদুর্গা ও সিন্ধুদুর্গা সহ মাতৃ দেবীর নাম আছে ৷ সামবেদীয় কেনোপনিষদে হৈমবতী উমা ইন্দ্রকে দেখা দিয়ে জানান যে তাঁর ব্রহ্মশক্তির দ্বারাই দেবতারা এত শক্তিশালী এবং অসুর বিজয়ী ৷ তাঁর শক্তি ছাড়া বায়ু এক খন্ড তৃণ উড়িয়ে নিয়ে যেতে অক্ষম ৷ অর্থব বেদের পৃথিবী সূক্তে মাতৃবন্দনার অনুপম স্তুতি দেখি ৷ শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে জ্ঞান শক্তি , বল শক্তি ও ক্রিয়া শক্তির কথা আছে ৷ শ্রীমদভাগবতে দ্বারকায় শ্রীকৃষ্ণের বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য দ্বারকাবাসীর  দেবী দুর্গার স্তব রয়েছে ৷  বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মেও  তারা ( ইনিই দশ মহাবিদ্যার দ্বিতীয় হয়ে হিন্দু ধর্মে ), একজটা , প্রজ্ঞাপারমিতা , জৈনদের শাসন দেবী , পদ্মাবতী প্রমুখ দেবী পূজা হতে দেখি ৷ নিম্বার্ক মতে বৃষভানুকন্যা রাধা শ্রীকৃষ্ণের আনন্দ শক্তি ৷ মাধবাচার্যের মতে লক্ষ্মী  দেবী বিষ্ণুর ক্রিয়া শক্তি ৷ তবে ,ভারতে মাতৃপূজার বিকাশ শাক্ত মত ও তন্ত্রের মধ্য দিয়ে ৷ যেখানে মা হলেন স্বয়ং বিশ্বের সৃষ্টিকর্ত্রী ৷ এখানে বলা হয়েছে আদ্যাশক্তি মহামায়া নিজ দেহ থেকে ব্রহ্মা , বিষ্ণু ও মহেশ্বরকে সৃষ্টি করেন এবং নিজেকে তিনভাগ করে তাঁদের সহচরী হন ৷ যে কারণে হয় জগৎ সংসার ও জীবনের উদ্ভব ৷ তন্ত্রের সব তত্বই একাক্ষরা বীজের মধ্যে বিদ্যমান ৷ সংস্কৃতের পঞ্চাশটি বর্ণ মাতৃকা বর্ণ ৷ যা সরস্বতীর অক্ষমালা ৷ আবার মা কালীর মুন্ডমালা ৷ দেবী ভাগবতে মা নিজে বলেছেন যে তিনিই প্রত্যক্ষ , অপ্রত্যক্ষ ও তুরীয় দৈবসত্ত্বা ৷ তিনি সূর্য ,নক্ষত্র , ব্রহ্মান্ড ,তিনিই নারী , পুরুষ এবং জড় ৷ শক্তিসাধনায় দেখি দুর্গা ও কালীর পূজা ৷ ঋগ্বেদের রাত্রিসূক্তের (১০/১২৭) রাত্রি দেবী ও শতপথ ব্রাহ্মণের (৭/২/৭)  এবং ঐতরেয় ব্রাহ্মণের  নিঋতি দেবী (৪/১৭)  মনেহয় পরে কালী রূপে সাধকের চোখে ধরা দিয়েছেন ৷ মুন্ডক উপনিষদে তাই "কালী " অগ্নির সাতটি জিহ্বার দুটি কালী ও করালী ৷ মহাভারতেও তাঁর কথা আছে ৷ কালিদাসের "রঘুবংশে" দেবী কালিকার উল্লেখ আছে ৷ আর দুর্গা বা পার্বতীরও অনেক বর্ণনা নানা জায়গায় পাই ৷ কালিদাসের "কুমারসম্ভব" -এ উমার সাথে মহাদেবের বিয়ের কথা আছে ৷ সনাতন ধর্মে দেবীরা অসুর অর্থাৎ অশুভ শক্তির বিনাশকারিনী , পরমমঙ্গলময়ী ও মাতৃস্বরূপিনী ৷ আবার দুর্গা মা থেকে হয়ে উঠেছেন ঘরের মেয়ে ভগবতী ৷ ঈশ্বরের মাতৃরূপ ছাড়া কি উনি এত নিকটজন হতে পারতেন ? তাই , হিন্দু ধর্মে  নারী " পরমেশ্বরী " -র প্রকাশ  ৷ অথচ , সনাতন ধর্মের প্রকৃত তত্ত্ব না বুঝে দেশের সর্বত্র হয়ে চলেছে নারী নির্যাতন , ধর্ষণ , কন্যা ভ্রণ হত্যার মত অমানবিক ব্যাপার ! আজকের নারী দিবসের বিশেষ দিনে আমাদের বুঝতে হবে বিশ্বের যা কিছু কল্যাণকর তার অর্ধেক নারী সৃষ্ট ৷ জননী , জায়া ও কন্যা ছাড়া সমাজ , সংসার অচল ৷ সমস্ত নারীর প্রতি শ্রদ্ধা , স্নেহ ও ভালোবাসা ৷ 

॰॰॰॰॰॰ ডাঃদীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় ৷

            ৯৭৩২২১৭৪৮৯

Post a Comment

0 Comments