অশ্বত্থামা যদি ভগবান শিবের অংশাবতার হন, তাহলে তিনি অন্যায়ের পক্ষে লড়লেন কেন?
অশ্বত্থামা ছিলেন গুরু দ্রোণাচার্যের পুত্র এবং একজন মহাবীর যোদ্ধা। তিনি কৌরবদের পক্ষ থেকে যুদ্ধ করেছিলেন কারণ কৌরবরা তার পরিবার এবং গুরুকুলের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। তবে তার লড়াই করার মূল কারণ ছিল পিতার প্রতিশোধ। পিতা দ্রোণাচার্যর হত্যার পর, ক্রোধের বসে তিনি রাতে পাণ্ডব শিবিরে হামলা চালিয়ে দ্রৌপদীর পাঁচ পুত্রসহ অনেক নিরপরাধকে হত্যা করেন।
ভগবান শিব যিনি ধ্বংসের দেবতা, তিনি কেবল ন্যায় বা অন্যায়ের প্রতীক নন, বরং তিনি কর্মফল এবং সৃষ্টির চক্রেরও রক্ষক। শিবের অবতার মানেই তিনি সর্বজ্ঞ হবেন, এমনটা নয়। মহাভারতে প্রায়শই দেখা যায়, অবতার বা মহান ব্যক্তিত্বরাও তাঁদের কর্মফল ভোগ করেন। অশ্বত্থামা ছিল এক মহাযোদ্ধা, কিন্তু তার ক্রোধ ও মোহ তাকে অন্ধ করে দিয়েছিল, যা তার পতনের কারণ হয়।
যখন অশ্বত্থামা দ্রৌপদীর পুত্রদের হত্যা করলেন, তখন তিনি গুরুতর পাপ করলেন। এরপর, তিনি ব্রহ্মশির অস্ত্র ব্যবহার করে উত্তরা গর্ভস্থ শিশুকে (অভিমন্যুর পুত্র, পরীক্ষিত) মারতে চাইলেন, যা মহাপাপ। এই দুই ঘটনার কারণে শ্রীকৃষ্ণ তাকে অভিশাপ দেন যে, তিনি যুগ যুগান্তর চিরকাল ধরে পৃথিবীতে একাকী, রোগাক্রান্ত এবং কষ্ট ভোগ করবেন।
অশ্বত্থামা ভগবান শিবের অবতার হলেও, তার মোহ ও ক্রোধ তাকে অন্যায়ের পথে পরিচালিত করেছিল, ফলে তিনি তার কর্মফলের শাস্তি পান। ভগবান শিবও যদি কোনও দেহে আবির্ভূত হন, সেই দেহধারীকে কর্মফল ভোগ করতেই হয়—এটাই ধর্মের নিয়ম।
অশ্বত্থামার কাহিনী থেকে বোঝা যায় যে, শক্তি থাকলেই ন্যায়বিচার হয় না, বরং বুদ্ধি, ধৈর্য ও ধর্মের পথ অনুসরণ করাই প্রকৃত ন্যায়ের পথ। শিবের অবতার হয়েও যদি কেউ ধর্মচ্যুত হয়, তবে সে শাস্তি পাবে—এটাই মহাভারতের শিক্ষা।
বিঃদ্রঃ
অশ্বত্থামাকে শিবের অবতার হিসেবে গণ্য করা হয়, এবং এর শাস্ত্রীয় ভিত্তি পাওয়া যায় বিভিন্ন পুরাণ ও মহাকাব্যে। নিম্নে শাস্ত্রীয় রেফারেন্সসহ ব্যাখ্যা দেওয়া হলো-
মহাভারতে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, অশ্বত্থামা শিবের অংশ (অংশাবতার)। যখন দ্রোণাচার্যের স্ত্রী কৃপী গর্ভবতী ছিলেন, তখন তিনি দীর্ঘসময় ধরে এক শক্তিশালী সন্তানের জন্য তপস্যা করেছিলেন। তাঁর প্রার্থনায় সন্তুষ্ট হয়ে শ্রী শংকর তাঁর এক অংশকে অশ্বত্থামার রূপে পাঠান।
এছাড়াও, মহাভারতের সৌপ্তিক পর্বে বর্ণিত আছে যে, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর, অশ্বত্থামা যখন পাণ্ডবদের হত্যা করতে চেয়েছিল, তখন সে শিবের বিশেষ কৃপা লাভ করেছিল এবং শিব স্বয়ং তার সঙ্গে থেকে যুদ্ধ করেছিলেন।
বিভিন্ন পুরাণে অশ্বত্থামাকে রুদ্রের অংশ বা শিবের অবতার বলে উল্লেখ করা হয়েছে—
(ক) শিব পুরাণ
শিব পুরাণ অনুসারে, শিবের অংশ থেকে জন্ম নেওয়া কিছু বিশেষ চরিত্রের মধ্যে অশ্বত্থামাও একজন।
(Shiva Purana, Rudra Samhita, 6.12.23)
অর্থ: "অশ্বত্থামা রুদ্রের অংশ থেকে জন্মগ্রহণ করেছেন, এবং তিনি অত্যন্ত শক্তিশালী।"
(খ) স্কন্দ পুরাণ
স্কন্দ পুরাণে বলা হয়েছে যে, কলিযুগে অশ্বত্থামাই একমাত্র জীবিত ব্যক্তি থাকবেন, এবং শিবের শক্তি দ্বারা তিনি চিরঞ্জীব হয়ে থাকবেন।
(Skanda Purana, 3.12.42)
অর্থ: "অশ্বত্থামা হলেন রুদ্রের অংশ, যিনি অমর এবং চিরকাল দেবী পার্বতীর প্রিয়।"
অশ্বত্থামার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল তাঁর চিরঞ্জীবত্ব। শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে, তিনি অনন্তকাল ধরে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াবেন, যা রুদ্রের এক রূপের প্রতিফলন। রুদ্র হলেন অনন্ত এবং ধ্বংসের প্রতীক, যা অশ্বত্থামার চরিত্রের সঙ্গে মেলে।
শিবের মতোই, অশ্বত্থামাও ধ্বংসাত্মক রূপে আবির্ভূত হন যখন তিনি পাণ্ডবদের হত্যার চেষ্টা করেন।
উপরোক্ত শাস্ত্রীয় রেফারেন্স থেকে বোঝা যায় যে, অশ্বত্থামা সরাসরি শিবের পূর্ণ অবতার না হলেও তিনি রুদ্র বা শিবের অংশাবতার। মহাভারত, শিব পুরাণ, স্কন্দ পুরাণ প্রভৃতি গ্রন্থে এর উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া, তাঁর অমরত্ব, ধ্বংসাত্মক প্রকৃতি এবং অতিমানবীয় শক্তি— সবই তাঁকে শিবের এক রূপ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

0 Comments