কালা যাদু
(পর্বঃ ০১) অদৃশ্য শত্রুর ছায়া
কালা যাদু
পর্ব ১:
অদৃশ্য শত্রুর ছায়া
আমার নাম জয়ন্ত কর্মকার। ছোটবেলা থেকেই বই আর বিজ্ঞান ছিল আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। অন্যরা যখন অলৌকিক গল্প শুনে চমকে উঠত, আমি তখন খুঁজতাম—এই ঘটনার পেছনে কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে কি না। পরিবারের অনেকেই পুজো-আচ্চা, তাবিজ-কবজে বিশ্বাস করত, কিন্তু আমি বরাবর যুক্তিবাদী ছিলাম। আমার বিশ্বাস ছিল—মানুষ নিজে নিজের ভাগ্য গড়ে তোলে। কোনো অদৃশ্য শক্তি, কোনো মন্ত্রতন্ত্র মানুষের জীবনকে চালাতে পারে না।
তবে একথা ঠিক, ছোটবেলায় আমাদের পরিবারটা ছিল বেশ অদ্ভুত। আমরা যাকে "পরিবার" বলি, সেই ব্যাপারটা আমাদের জন্য একটু জটিল ছিল। মা-বাবা, দাদা, বোনের বাইরে আরও অনেক আত্মীয় ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে ছিল আমাদের জীবনে। একান্নবর্তী না হলেও সম্পর্কগুলো ছিল ওতপ্রোত। কিন্তু সেই সম্পর্কের ভেতরে যে কতটা ঈর্ষা, হিংসা আর ছলনার বিষ লুকিয়ে ছিল—তা তখন বুঝিনি।
আমার পড়াশোনার শুরুটা ভালোই হয়েছিল। স্কুলে শিক্ষকরা আমাকে পছন্দ করত, ক্লাসে প্রশ্নের উত্তর দিয়ে আমি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতাম। প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু পুরস্কার, কিছু সম্মাননা পেতাম—যা আমাকে আরও উৎসাহী করত। কিন্তু এরপর থেকেই ধীরে ধীরে যেন এক অদৃশ্য বাঁধা ঘিরে ধরল।
পরীক্ষার ঠিক আগের রাতে জ্বর হওয়া, মাথা ব্যথা, হঠাৎ করে মনে হওয়া যে পড়া কিছুই মনে নেই—এই ঘটনাগুলো প্রায় নিয়মিত হয়ে উঠেছিল। অথচ পরীক্ষা শেষ হলে, সব কিছু আবার স্বাভাবিক। ডাক্তার দেখালে বলে, কোনো সমস্যা নেই, শুধু মানসিক চাপ। কিন্তু আমি জানতাম, আমি ভেঙে পড়িনি, আমি বরং বেশ প্রস্তুত থাকি সবসময়।
এমনও হয়েছে, প্রশ্নপত্র দেখে মনে হয়েছে আমি এই সব পড়েছি, কিন্তু কলম হাতে তুলে লিখতে গিয়ে—মাথা একেবারে ফাঁকা! উত্তর যেন ঠোঁটের ডগায় এসে আটকে গেছে। পরীক্ষার পর মনে হয়েছে, এটা তো আমি পারতাম—কীভাবে ভুলে গেলাম?
এইরকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি এতটাই বেশি হয়েছিল যে আমি নিজের আত্মবিশ্বাস হারাতে শুরু করলাম। আশেপাশের লোকেরা বলত, "বেশি চাপ নিচ্ছো", কেউ কেউ বলত, "সবাই তো ভালো রেজাল্ট করে না!" কিন্তু মা... মা কেমন যেন চিন্তিত হয়ে উঠেছিলেন। মাঝে মাঝে রাতে আমি দেখতাম, তিনি চুপচাপ ঠাকুরঘরের সামনে বসে আছেন, কিছু বলছেন না, শুধু তাকিয়ে আছেন।
এরপর একদিন হঠাৎ করেই মা বললেন, “তোর ওপরে নজর লেগেছে রে।”
আমি হেসে বলেছিলাম, “মা, আমি বিজ্ঞান পড়ি। এইসব নজর, ঝাড়ফুঁক এসব বিশ্বাস করো কেন?”
মা শুধু বলেছিলেন, “সব কিছু বিজ্ঞান দিয়ে বোঝা যায় না রে। অনেক কিছু আছে যা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু সেটা যে আছে, তা টের পাওয়া যায়।”
সেই সময় কথাটা গুরুত্ব দিয়ে নিইনি। কিন্তু মা আস্তে আস্তে গল্প করতে শুরু করলেন—কিভাবে আমাদের কিছু আত্মীয়, যারা বাইরে থেকে হাসিমুখে কথা বলে, ভিতরে ভিতরে হিংসা পুষে রাখে। কিভাবে তারা মন্দিরের পেছনে গিয়ে "কাজ" করায়। মা’র মুখে এমনসব গল্প শুনে শিউরে উঠেছিলাম—পাঁশ চিমটে নেওয়া মাটি, ঘুমন্ত মানুষের চুল কেটে নেওয়া, লুকিয়ে রাখা ছবি পুড়িয়ে ফেলা!
প্রথমে আমি সবটা গল্প বলে মনে করতাম। কিন্তু ধীরে ধীরে কিছু জিনিস চোখে পড়তে লাগল। বাড়ির পেছনে মাঝে মাঝে অদ্ভুত জিনিস পাওয়া যেত—পুরোনো পুটলি, গন্ধযুক্ত তাবিজ, মাটি মাখা সুতোর গিট্টু। মা এসব পেয়ে খুব ভয় পেতেন।
আমি এসব মানতে চাইতাম না, কিন্তু একদিন আমার এক আত্মীয়র কথাবার্তায় কেমন যেন সন্দেহ জাগল। তিনি বলেছিলেন, “জয়ন্ত তো খুব ভালো পড়ুয়া, কিন্তু রেজাল্ট কেন যেন ঠিক আসে না! হাহাহা... ভাগ্য খারাপ কিনা!”—এই কথা বলার ভঙ্গি, হাসিটা যেন মনের ভেতর কাঁটা বিঁধিয়ে গেল।
এরপর আর নিজেকে ধোঁকায় রাখতে পারিনি। সব কিছু মিলিয়ে বুঝলাম, এ এক অদৃশ্য শত্রুর ছায়া—যার অস্তিত্ব আমি অস্বীকার করলেও সে আমার জীবনে প্রভাব ফেলছিল।
সেই সময় আমার হাতে কোনো প্রতিকার ছিল না। ঝাড়ফুঁকের দোকানে যাওয়ার কথা ভাবতেও পারতাম না। শুধু ঈশ্বরে ভরসা করে চলেছি।
ঠিক সেই সময়, আমার পুরোনো এক বন্ধু, নূর মোহাম্মদ, আমাদের বাড়িতে এল। সে আমারই সমবয়সী—ছোটবেলা থেকে একই পাড়ায় বড় হওয়া, স্কুলে হয়তো আলাদা পড়েছি, কিন্তু পাড়ার বিভিন্ন অনুষ্ঠান আর খেলাধুলায় ওর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল।
নূর সবসময় একটু অন্যরকম ছিল। চুপচাপ, ভেবেচিন্তে কথা বলা স্বভাব, আর বয়সের তুলনায় একটা গভীরতা ছিল ওর চোখে। তার বাবা ছিলেন খ্যাতিমান এক দরবেশ-ধর্মগুরু, যিনি বহু বছর ধরে লোকের বিপদ-আপদ দূর করতেন, বিশেষ করে যেসব সমস্যা "কালা যাদু" থেকে সৃষ্টি হতো বলে লোকেরা বিশ্বাস করত।
আমি ওর দিকে তাকিয়ে হেসে বললাম, “তুই কি এখন তাবিজ-কবজের ডাক্তার হয়েছিস নাকি?”
নূর হেসে বলল, “আমি ডাক্তার না, কিন্তু কিছু কিছু জিনিস বুঝতে শিখেছি। বাবা আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছেন—তাদের ভাষায় যাকে বলে হিফাযতের বিদ্যা, মানে আত্মরক্ষা।”
আমার অবিশ্বাসী মুখ দেখে সে বলল, “তুই বিজ্ঞান পড়িস, আমি জানি। কিন্তু বিজ্ঞান সব ব্যাখ্যা করতে পারে না, ভাই। কিছু কিছু শক্তি আছে, যেগুলো মনের ভিতর, চিন্তার মধ্যে খোঁজ নিতে হয়।”
এরপর ও একদিন রাতে আমাকে নিয়ে বাড়ির পেছনে গেল। ওর সঙ্গে ছিল একটা ছোট ব্যাগ—ভেতরে কিছু ঘাসপাতা, তামার পাত্র, এবং একটা পুরোনো কাপড় মোড়া কিছু বস্তু। সেখানে গিয়ে ও কিছুক্ষণ নির্জনে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর মাটির নিচে হাত ঢুকিয়ে কিছু একটা বার করল—একটা পুটলি, যার ভেতরে ছিল আমার নাম লেখা একটা ছোট কাগজ, কিছু চুল, আর একটা গন্ধমাখা তাবিজ।
আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।
নূর বলল, “দেখলি? আমি না এলে এটা হয়তো এখানেই থাকত। এই তাবিজ তোর উন্নতির গতিবেগ আটকে রাখছিল।”
তারপর সে তার শেখা প্রক্রিয়া অনুযায়ী তাবিজটা নিষ্ক্রিয় করে ফেলল—ধূপ, কিছু নির্দিষ্ট দোয়া, এবং কিছু মাটি দিয়ে তৈরি একটি বৃত্তের ভেতর ওই বস্তুটিকে পুড়িয়ে দিল।
সেই দিনই প্রথম আমি অনুভব করেছিলাম—কালা যাদু শুধু একজনকে ভয়ের মধ্যে ফেলে দেয় না, সে নিজের চারপাশে একটা অদৃশ্য কুয়াশা তৈরি করে, যার মধ্যে থেকে মানুষ নিজের পথ খুঁজে পায় না। আর নূরের মতো কেউ যদি সেই কুয়াশার ফাঁকে আলো দেখায়, তখন তবেই পথ মেলে।
চলবে.....................
✍️ রতন কর্মকার

0 Comments