Recent Posts

6/recent/ticker-posts

ব্রহ্মাণ্ড ছিলো না যখন, মুন্ডমালা কোথায় পেলি?

 



"ব্রহ্মাণ্ড ছিলো না যখন, মুন্ডমালা কোথায় পেলি?"

“ব্রহ্মাণ্ড ছিলো না যখন”

এই বাক্যাংশটি নির্দেশ করে সেই মহাশূন্য সময়কে যখন: সময়, স্থান, পদার্থ বা জীবন কিছুই ছিল না, সৃষ্টি এখনও ঘটেনি, কোনো ব্যক্তি, চরিত্র বা মূর্তি ছিল না।

এই অবস্থা হিন্দু দর্শনে পরিচিত "অব্যক্ত", "মূল প্রকৃতি", অথবা "অসত্তা" হিসেবে—যেখানে সমস্ত কিছু সুপ্ত, অনাবিষ্কৃত এবং অনন্ত সম্ভাবনার মধ্যে বিলীন।

ঐ অবস্থা কোনো রূপ বা ব্যক্তিত্ব ধারণ করে না। সেখানে কালী নেই, বিষ্ণু নেই, ব্রহ্মা নেই—আছে কেবল এক চেতনা যা পরম, নিরাকার, অসীম।

তাহলে প্রশ্ন আসে, মুন্ডমালা কোথা থেকে এল? কে ছিল যার মুন্ডমালা তৈরি হলো?

*#মুন্ডমালার_প্রতীকতত্ত্ব:

‘মুন্ডমালা’ কালীমায়ের গলায় পরা মুন্ডের মালা। বহির্দৃষ্টিতে এটি সহিংস, ভয়ঙ্কর—কিন্তু অন্তর্দৃষ্টিতে এটি এক মহান আধ্যাত্মিক চিহ্ন।

মুন্ডমালা আসলে অহংকার, কাম, লোভ, মোহ প্রভৃতির প্রতীক। এইসব ‘মুন্ড’ অর্থাৎ ‘মস্তক’ আসলে মানুষের ভেতরের স্বার্থপরতা, আসক্তি, ও জড়তাকে বোঝায়। কালী এইসব দুর্বলতাকে জয় করে, সেই জয়ের চিহ্নস্বরূপ গলায় মালা পরেছেন।

তন্ত্র মতে, মুন্ডমালায় ৫১টি মুন্ড থাকে—যা ৫১টি বর্ণমালা বা ধ্বনি-বীজ-এর প্রতীক। প্রতিটি অক্ষর একেকটি দেবীশক্তির বিকাশ।

অতএব, কালী নিজেই সৃষ্টি-উৎস, তিনিই সৃষ্টির প্রতিটি ধ্বনি ও অস্তিত্বের আধার।

"কালী" মানেই "কাল" বা সময়। তিনি সময়ের স্রষ্টা ও ধ্বংসকারী। মুন্ডমালা হল তাঁর মৃত্যুর জয়ের মালা। সময়ের যে মুখে সব হারায়, কালী সেই সময়কে নিজের অলংকার করে রেখেছেন।

তন্ত্রসাহিত্যে কালী শুধু দেবী নন—তিনি আদ্যাশক্তি, আদ্যাশূন্যতা এবং অপরিমেয় চেতনার মূর্ত রূপ।

"সৃষ্টি, স্থিতি, লয়, অনুগ্ৰহ ও তিরোভাব – এই পঞ্চক্রিয়া যাঁর দ্বারা সংঘটিত হয়, তিনিই আদ্যাশক্তি।" (কালী তন্ত্র)

তিনি ব্রহ্মাণ্ডের আগে ছিলেন, তার মধ্যেও আছেন, এবং পরে থাকবেন। মুন্ডমালা তাই কেবল মস্তক নয়—এ এক রূপহীন চেতনার রূপান্তরিত অভিব্যক্তি।

এই প্রশ্ন আসলে কাকে করা হচ্ছে?

যখন বলা হয়—"মুন্ডমালা কোথায় পেলি?", তখন সেটি কালীকে নয়, নিজেরই চেতনাকে প্রশ্ন করা হচ্ছে।

"আমার যখন সৃষ্টি হয়নি, তখন আমার অহং কোথা থেকে এলো? যে আমি শূন্যে বিলীন, সেই আমি নিজেকে কীভাবে সাজাই?"

এই প্রশ্ন আত্মজিজ্ঞাসা। আত্মার পরম রূপ জানার একটি রূপকধর্মী প্রয়াস।

এই এক পংক্তি—"ব্রহ্মাণ্ড ছিলো না যখন, মুন্ডমালা কোথায় পেলি..."—আমাদের আনে এক ধ্যানজাগ্রত চেতনায়। এটি শুধু এক দেবীর উদ্দেশে প্রশ্ন নয়, এটি এক আত্মানুসন্ধান। এখানে কালী কেবল মূর্তি নন—তিনি এক অহমরহিত চেতনাশক্তি, যিনি সৃষ্টি ও মৃত্যুর উর্দ্ধে।

(তাৎপর্য ব্যাখ্যাঃ রতন কর্মকার)

Post a Comment

0 Comments