Recent Posts

6/recent/ticker-posts

সন্ধান (৫ম - শেষ পর্ব)

 



সন্ধান (৫ম - শেষ পর্ব)

*#আত্মসন্ধানের_শুরু

অনিকের জীবন একদম শান্তি ছিল না। সে একের পর এক ধর্মগ্রন্থ পড়েছে, তীর্থস্থানে গিয়ে প্রার্থনা করেছে, দেহ ও মনের উন্নতির জন্য বিভিন্ন আচার পালন করেছে, কিন্তু কোনোটিতেই সে পূর্ণ শান্তি বা আত্মতৃপ্তি খুঁজে পায়নি। সে ভেবেছিল, বাহ্যিক কিছু অনুসরণ করে একদিন ঈশ্বরের পূর্ণ দর্শন পাবে, কিন্তু আসলে তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা ছিল। তার আত্মা শান্তি ও আলো খুঁজছিল, কিন্তু বাইরের পৃথিবী থেকে তা কিছুতেই আসছিল না।

একদিন, এক সাধক গুরু অনিকের জীবনে এলেন। তিনি কোনো গ্রন্থ পড়তে, কোনো বাহ্যিক নিয়মের অনুসরণ করতে তাকে বললেন না। বরং তিনি অনিককে বললেন, "তুমি বাইরের ঈশ্বরকে খুঁজে পাবে না। প্রকৃত ঈশ্বর তোমার নিজের আত্মার গভীরে আছে। তুমিই নিজেকে জানো, তোমার ভিতরের ঈশ্বরকেই জানো।"

এই বাক্য অনিকের জীবনকে এক নতুন দিগন্তে নিয়ে গেলো। এতদিন সে বাইরের পৃথিবীতে ঈশ্বরকে খুঁজতে গিয়েছিল, কিন্তু এই কথা শুনে তাকে অনুভব হলো, আসল ঈশ্বর তার ভিতরের গভীরে বসবাস করছে। তাকে শুধুমাত্র নিজের মধ্যেই ঈশ্বরকে খুঁজে পেতে হবে। কিন্তু কীভাবে? তিনি কিভাবে নিজের ভিতরের ঈশ্বরের উপস্থিতি অনুভব করবেন?

এই ভাবনাগুলির মধ্য দিয়ে অনিক একদিন নদীর ধারে বসে ধ্যান করতে শুরু করলেন। প্রথমদিকে তার মন ছিল একদম অস্থির। মন নানা চিন্তা ও উদ্বেগে ভরা ছিল। সে প্রায় হারিয়ে ফেলেছিল যে, তাকে ধ্যান করতে হবে বা ঈশ্বরের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। কিন্তু প্রতি দিন, প্রতিটি মুহূর্তে, সে চেষ্টা করতো নিজেকে শান্ত রাখতে, নিজেকে কেন্দ্রিত করতে। ধীরে ধীরে, তার মনের অস্থিরতা কমতে শুরু করল। তার ধ্যানের মধ্যে এক অদ্ভুত প্রশান্তি আসতে শুরু করলো।

প্রথম প্রথম, তার মনে হয়েছিল, এটা কেবলমাত্র একটি স্বাভাবিক মানসিক শান্তি। কিন্তু একদিন, ধ্যানের মধ্যে তিনি অনুভব করলেন যে, তার হৃদয়ের গভীরে যেন এক অদ্ভুত আলোর ঝলকানি হচ্ছে। তার মনের মধ্যে একটি শান্তি প্রবাহিত হচ্ছিল, যা এতদিন সে বাইরের পৃথিবীতে খুঁজে পেত না। তার হৃদয়ে একটি শক্তিশালী অনুভব ছিল, যেন ঈশ্বর তার হৃদয়ের গভীরে আছেন এবং সেই অভ্যন্তরীণ আলোই তার আত্মার প্রকৃত স্বরূপ।

অনিক তখন বুঝতে পারলেন যে, তিনি যা এতদিন খুঁজে পেয়েছিলেন, তা সবই ছিল বাইরে, বাহিরের জগতের মধ্যে। কিন্তু ঈশ্বর তো কোথাও বাইরে নেই, তিনি আছেন তার ভিতরেই। তিনি অনুভব করলেন, যে শান্তি, যা খুঁজছিলেন, তা আসলে তার নিজের আত্মার মধ্যে বিরাজমান। আর সেই শান্তি বা পূর্ণতা বাইরের কোনও তীর্থস্থান বা বাহ্যিক সাধনায় পাওয়া সম্ভব নয়—তা শুধুমাত্র নিজের ভেতর খুঁজে পাওয়া যেতে পারে।

এই উপলব্ধি অনিককে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিল। তিনি বুঝতে পারলেন যে, যতই বাহ্যিক দিক থেকে কিছু করার চেষ্টা করেন, ততই তার আত্মার প্রকৃত শান্তি থেকে দূরে সরে যাবেন। তার পথ হল—আত্মানুসন্ধান, নিজের মনের গভীরে ঢোকা, যেখানে ঈশ্বরের উপস্থিতি নিজে অনুভব করা যায়।

এই সময়, তিনি আরো অনুভব করলেন যে, একজন সদগুরু প্রয়োজন। তিনি জানতেন, একজন সাধু গুরু বা প্রজ্ঞাময় ব্যক্তির সঙ্গে মিলিত হলে তার সাধনার পথ আরো সহজ হতে পারে। তিনি গুরুর খোঁজে বেরিয়ে পড়লেন। তাঁর মধ্যে এক অদ্ভুত আকাঙ্ক্ষা জন্ম নিলো—যে গুরু তাকে অন্তরের অন্ধকার থেকে মুক্তি দিয়ে সত্যের দিকে পথ দেখাবে।

অনিক দীর্ঘদিন সাধনা ও অনুসন্ধান চালিয়ে গেলেন, বহু গুরুর সাথে সাক্ষাৎ করলেন, কিন্তু কোনো একগুঁয়ে হৃদয়ে তিনি বুঝে উঠতে পারছিলেন না যে, তাঁর সন্ধান সত্যিই কী হবে। একদিন, তিনি একটি গ্রামে এসে পৌঁছালেন, যেখানে এক সাধু গুরু ছিলেন। এই গুরু ছিলেন একেবারে অন্য রকম—তাঁর চোখে গভীর শান্তি, তাঁর মুখে এমন এক হাসি ছিল, যা অনিককে এক অবর্ণনীয় শান্তি ও ভালোলাগা অনুভব করিয়ে দেয়।

গুরুকে দেখে, অনিকের মনে এক অদ্ভুত বিশ্বাস জেগে উঠল। তিনি বুঝতে পারলেন যে, এই গুরুই তাঁর জন্য প্রকৃত পথপ্রদর্শক হতে পারেন। তিনি সেদিনই গুরুদেবের কাছে গিয়ে সজ্ঞানে অনুরোধ জানালেন, "গুরু, আমাকে পথ দেখান, আমার অন্তরকে আলোকিত করুন।"

গুরু তাঁকে স্নেহের সাথে গ্রহণ করলেন এবং বললেন, "তুমি যা খুঁজছ, তা তোমার নিজের ভেতরেই ছিল, তবে আমি তোমাকে সেই পথে পরিচালনা করবো। তোমার আত্মার পূর্ণ পরিচয় এবং ঈশ্বরের দর্শন, যা তুমি এতদিন খুঁজে পেতে চাইছিলে, তা এখন থেকে তোমার ভিতরেই উদিত হবে।"

গুরুর কথাগুলি অনিকের মনের গভীরে প্রবাহিত হলো, এবং তিনি তার ধ্যানের মাধ্যমে আরো গভীরে যেতে শুরু করলেন। প্রতিদিনের সাধনায়, প্রতিটি মুহূর্তে, তাঁর আত্মা আরো অধিক পরিস্কার, শান্ত এবং আলোকিত হতে লাগলো। তাঁর অভ্যন্তরীণ ঈশ্বরের সাথে এক দৃঢ় সংযোগ স্থাপিত হলো।

অনিকের আত্মসন্ধান শেষ হলো, কিন্তু এই শেষতা একটি নতুন সূচনা ছিল। তিনি উপলব্ধি করলেন, যে ঈশ্বরের সান্নিধ্য ও শান্তি বাইরের কিছুতে পাওয়া সম্ভব নয়—তাকে খুঁজতে হলে, নিজের গভীরে প্রবেশ করতে হয়। এবার, অনিক নিজেকে চিনতে শিখলেন, এবং তাঁর জীবন পূর্ণ হয়ে উঠলো সেই অভ্যন্তরীণ শান্তি ও আলোর অভিজ্ঞতায়।

অনিক বুঝতে পারলো, অর্থলোভী ব্যবসায়ী সংগঠনের ( সৎসঙ্গ, ইসকন) ফাঁদে পড়লে মুক্তি নয় বরং বন্ধনই হবে। এতে আধ্যাত্মিক উন্নতি তো হবেই না বরং অমূল্য মানব জীবন, ধর্ম ব্যবসায়ীদের মিথ্যা প্ররোচনায় নষ্ট করে আবার পশুযোনীতে ফিরে যেতে হবে।

এভাবে, অনিক সদগুরুর সন্ধান পেলেন, এবং তাঁর জীবনে সত্য, শান্তি, এবং পূর্ণতা স্থায়ী হয়ে গেলো।

✍️ রতন কর্মকার

Post a Comment

0 Comments