ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিন্
নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ ।
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো
ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে ॥২০॥
***#অর্থঃ
তাঁহার জন্ম নাই কারণ তিনি নিত্য, সবর্বব্যাপক, জন্মাবার জায়গা কই—মৃত্যু নিত্য বস্তুর কোথা? সবই ব্রহ্ম। তবে এক বস্তু হইতে অন্য বস্তুর পরিবর্ত্তন কেমনে হইবে? ইহা কখনই হইতে পারে না, যাহা দেখিতেছ হইয়াছে সে কেবল দৃষ্টিস্বরূপ আকার যাহা মিথ্যা, তাহাও ব্রহ্মেতে লীন হইবে। ও হওয়া না হওয়া সমান; যখন হওয়া না হওয়া সমান আর হয়ওনি, তখন আবার কি প্রকারে হইবে? কোন কিছু হইতে হয় নি! কারণ স্বয়ম্ভূ ব্রহ্ম নিত্য পুরাণ পুরুষ, ইনি হনন করেন না, কারণ কিসের দ্বারায় হনন করিবেন? যাহার দ্বারা হনন করিবেন তাহাতেও ব্রহ্ম, যাঁহাকে হনন করিবেন তিনিও ব্রহ্ম, সুতরাং ব্রহ্ম ব্রহ্মকে কিরূপে হনন করিবেন? এ শরীর যে তাহার হনন সদা সর্বদাই হইতেছে তবে হনন বিশিষ্ট অহন্য বস্তুকে কিরূপে হনন করিবে?
***#তাৎপর্য_ব্যাখ্যাঃ
শ্লোকটি মূলত অদ্বৈত বেদান্ত দর্শনের উপর ভিত্তি করে রচিত, যেখানে ব্রহ্মের চিরন্তন ও অদ্বিতীয় স্বরূপ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এটি মায়া, ব্রহ্ম, আত্মা, এবং অস্তিত্বের প্রকৃতি নিয়ে গভীর দার্শনিক আলোচনা করে। এখানে জন্ম-মৃত্যুর ধারণাকে মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং বোঝানো হয়েছে যে সবকিছুই ব্রহ্ম, তাই ধ্বংস বা সৃষ্টির প্রশ্নই ওঠে না।
ব্রহ্ম নিত্য, সর্বত্র বিরাজমান এবং অনাদি-অনন্ত। যদি ব্রহ্মের জন্ম হতো, তবে তার সৃষ্টি করতে হতো অন্য কোনো কিছুর দ্বারা, যা আবার ব্রহ্মের বাইরে কিছু থাকার সম্ভাবনা তৈরি করত। কিন্তু বেদান্ত মতে, "নেহানাস্তি কিঞ্চন", অর্থাৎ ব্রহ্মের বাইরে কিছুই নেই।
উপনিষদ বলে: "অজো নিত্যঃ শাশ্বতো ঽয়ং পুরাণো ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে।"
(কঠোপনিষদ ১/২/১৮)।
অর্থাৎ, আত্মা জন্মগ্রহণ করে না, চিরস্থায়ী, এটি পুরাতন হয় না এবং দেহ নষ্ট হলেও এটি ধ্বংস হয় না।
বেদান্ত মতে, যা পরিবর্তনশীল, তা প্রকৃত সত্য নয়। আমরা যা কিছু দেখছি, তা মূলত মায়া বা বিভ্রম।
শংকরাচার্য বলেন—
"ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা, জীবো ব্রহ্মই নাপরঃ।"
অর্থাৎ, ব্রহ্মই একমাত্র সত্য, জগৎ মায়াময় এবং জীবাত্মা ও পরমাত্মা অভিন্ন।
যেমন স্বপ্নে আমরা যা দেখি, তা জেগে ওঠার পর সত্য বলে মনে হয় না। একইভাবে, দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভর করে জগৎও মিথ্যা। এটি বিবর্তন বা পরিবর্তন নয়, বরং এক অনন্ত ব্রহ্মের বিভিন্ন প্রকাশ মাত্র।
আত্মা (ব্রহ্ম) অবিনশ্বর, তাই হত্যা বা ধ্বংস কেবল দেহের উপর প্রযোজ্য, আত্মার উপর নয়। যা হত্যা করছে এবং যা নিহত হচ্ছে—উভয়ই ব্রহ্মের অংশ, তাই সত্যিকারের হত্যার কোনো অস্তিত্ব নেই।
নাগার্জুনের শূন্যবাদ মতে — "সব কিছুর অস্তিত্ব আপেক্ষিক এবং কোনো কিছুই আসলেই সৃষ্টি হয়নি।"
অদ্বৈতবাদ (শংকরাচার্যের মতে) বলে— "ব্রহ্ম ছাড়া কিছুই নেই, পরিবর্তন ও সৃষ্টি মায়া মাত্র।"
যা কিছু অস্তিত্বশীল বলে মনে হয়, তা ক্ষণস্থায়ী এবং আপেক্ষিক। যেমন, নদীর জলে ঢেউ দেখা গেলেও, ঢেউ আসলে শুধুই জল।
অতএব, ব্রহ্মের সৃষ্টি বা বিনাশ হয় না। আমরা যা দেখি, তা আপেক্ষিক সত্য, কিন্তু পরম সত্য ব্রহ্ম অপরিবর্তনীয়। হনন বা ধ্বংস আত্মার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় – কারণ আত্মা অবিনশ্বর, যা ধ্বংস হয় তা কেবল দেহ। যা জন্মায়, তা ধ্বংস হয়; কিন্তু যা শাশ্বত, তার জন্মও নেই, মৃত্যু-নাশও নেই। পরম সত্য ব্রহ্ম এক ও অভিন্ন, এবং জগৎ ও পরিবর্তন কেবল মায়া মাত্র।
( বিঃদ্রঃ আমার স্বল্প জ্ঞান দিয়ে যোগীরাজ শ্যামাচরন লাহিড়ী মহাশয়ের লেখা গীতার অর্থের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি। বিজ্ঞ জনেরা ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। )
✍️ রতন কর্মকার

0 Comments