শিব ও ক্রিয়াযোগ
যোগশাস্ত্রের বিভিন্ন পথের মধ্যে ক্রিয়াযোগ একটি প্রাচীন ও গুপ্ত যোগপদ্ধতি, যার মাধ্যমে মানবজীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য—আত্মার মুক্তি—সাধন করা সম্ভব। ক্রিয়াযোগ মূলত গুরু-শিষ্য পরম্পরায় প্রচলিত, এবং শাস্ত্রমতে এটি স্বয়ং আদিগুরু শিব প্রদত্ত এক বিশেষ জ্ঞান। শিবকে বলা হয় যোগের আদি গুরু, যিনি যোগদর্শনের মূল প্রচারক।
‘ক্রিয়াযোগ’ শব্দটি দুটি অংশে বিভক্ত—
"ক্রিয়া" অর্থাৎ কর্ম বা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া এবং "যোগ" অর্থাৎ আত্মার সর্বোচ্চ চেতনার সঙ্গে মিলন।
অতএব, ক্রিয়াযোগ হল কিছু নির্দিষ্ট শাস্ত্রীয় অনুশীলনের মাধ্যমে চেতনার বিকাশ ঘটিয়ে শিবতত্ত্বে একীভূত হওয়ার একটি পথ।
শাস্ত্রীয় রেফারেন্স
শিবসংহিতা (৪.৭-৮):
> "যোগের মধ্যে ক্রিয়াযোগ শ্রেষ্ঠ, এই যোগের মাধ্যমে সাধক তার আত্মাকে শুদ্ধ করতে পারে এবং পরম ব্রহ্মের সঙ্গে মিলিত হতে পারে।"
হঠযোগ প্রদীপিকা (২.৭৮):
> "যে সাধক ক্রিয়াযোগের মাধ্যমে কুণ্ডলিনী শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে সক্ষম, সে মহাশূন্যে অবগাহন করে।"
শিব ও ক্রিয়াযোগের সংযোগ:
শিব হলেন যোগের আদিগুরু এবং সমস্ত যোগপদ্ধতির মূল উৎস। তিনি কেবল যোগী নন, বরং স্বয়ং যোগেশ্বর। সমস্ত যোগের মূল লক্ষ্য শিবতত্ত্ব উপলব্ধি করা, এবং ক্রিয়াযোগ এই লক্ষ্য অর্জনের অন্যতম প্রধান পথ।
শিবের যোগী রূপ ও শাস্ত্রীয় ভিত্তি:
শ্রীমদ্ভাগবতম (১০.৯০.৪৬):
"শিব যোগীরাজ, তিনি ধ্যানের মাধ্যমে ব্রহ্মত্বে লীন হন এবং যোগের মূর্ত প্রতীক।"
গোরক্ষ সংহিতা (২.৬):
"শিব স্বয়ং যোগের আদি গুরু, যিনি ক্রিয়াযোগের মাধ্যমে ভক্তদের মুক্তির পথ প্রদর্শন করেন।"
শিব নাথ সম্প্রদায়, তন্ত্রযোগ, হঠযোগ ও ক্রিয়াযোগের মূল গুরু। তিনি নাথ যোগীদের প্রথম গুরু হিসেবে পরিচিত, এবং অনেক প্রাচীন সাধকের কাছে তিনি স্বয়ং দর্শন দিয়েছেন।
ক্রিয়াযোগ প্রধানত পাঁচটি স্তর বা ধাপে বিভক্ত:
১. শুদ্ধিকরণ (নড়ি শুদ্ধি ও মন্ত্র জপ)
প্রথম ধাপে দেহ ও মনকে শুদ্ধ করা হয়। এর জন্য নির্দিষ্ট মন্ত্র জপ ও প্রাণায়ামের অনুশীলন করা হয়।
শাস্ত্রীয় রেফারেন্স:
"নাড়িশুদ্ধি ব্যতীত যোগসাধনা ফলপ্রসূ হয় না।"—(গোরক্ষ সংহিতা)
২. প্রাণায়াম ও শ্বাসনিয়ন্ত্রণ
নিয়ন্ত্রিত শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে চেতনার স্তর উন্নত করা হয়।
শাস্ত্রীয় রেফারেন্স:
"যে যোগী শ্বাস নিয়ন্ত্রণে দক্ষ, সে জীবন্মুক্ত হয়।"—(হঠযোগ প্রদীপিকা ২.১৫)
৩. ধ্যান (শিবতত্ত্বে একাগ্রতা)
শিবের নিরাকার বা নির্গুণ রূপে ধ্যান করা হয়। এটি ধ্যানযোগের মূল স্তর।
শাস্ত্রীয় রেফারেন্স:
"যে ব্যক্তি ধ্যানের মাধ্যমে চেতনাকে শিবত্বে স্থাপন করে, সে মুক্ত হয়ে যায়।"—(শিবপুরাণ)
৪. কুণ্ডলিনী জাগরণ
কুণ্ডলিনী শক্তি জাগানোর মাধ্যমে সাধক চেতনার উচ্চ স্তরে প্রবেশ করে।
শাস্ত্রীয় রেফারেন্স:
"কুণ্ডলিনী যখন সহস্রার চক্রে পৌঁছায়, তখন সাধক শিবের সঙ্গে একীভূত হয়।"—(যোগ বসিষ্ঠ)
৫. সমাধি ও শিবত্ব অর্জন
শেষ ধাপে সাধক শিবতত্ত্বে লীন হয়ে চরম মুক্তি লাভ করে।
শাস্ত্রীয় রেফারেন্স:
"যোগীর চূড়ান্ত লক্ষ্য হল সমাধির মাধ্যমে ব্রহ্মত্ব লাভ করা।"—(পতঞ্জলি যোগসূত্র)
ক্রিয়াযোগের সুফল ও শিবতত্ত্ব উপলব্ধি:
ক্রিয়াযোগের মাধ্যমে—
★ মন ও চেতনাগত বিশুদ্ধি ঘটে
★ শক্তি ও চেতনার উন্নতি হয়
★ কুণ্ডলিনী শক্তি জাগ্রত হয়
★ যোগী শিবতত্ত্ব উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়
শিবগীতা (৩.৩২):
"শিবসাধনা ও যোগের মাধ্যমে যে মুক্তিলাভ করে, সেই প্রকৃত শিবভক্ত।"
*#ক্রিয়াযোগ শুধুমাত্র শারীরিক বা মানসিক অনুশীলন নয়, এটি এক দৈব বিজ্ঞান যা সাধকের চেতনায় শিবতত্ত্বের প্রতিষ্ঠা করে। শিব সংহিতা, হঠযোগ প্রদীপিকা, গোরক্ষ সংহিতা ও বিভিন্ন যোগগ্রন্থে ক্রিয়াযোগের মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। শিব স্বয়ং আদিগুরু, এবং যোগের চূড়ান্ত লক্ষ্য হল তাঁর সঙ্গে একীভূত হওয়া। যারা প্রকৃত শিবসাধক, তাঁদের জন্য ক্রিয়াযোগই মোক্ষের শ্রেষ্ঠ পথ।
শিবসংহিতা (৫.৪৮):
"যে শিবতত্ত্ব উপলব্ধি করতে পারে, সেই প্রকৃত যোগী।"
✍️ রতন কর্মকার

0 Comments