বাংলা মাস অনুযায়ী মা দুর্গার বিভিন্ন রূপ ও পূজা
১. বৈশাখ – দেবী গণেশ্বরী
অর্থ ও পরিচয়: গণেশ্বরী শব্দের অর্থ গণপতির (গণেশ) অধিষ্ঠাত্রী দেবী। মা দুর্গার এই রূপ জ্ঞান, মঙ্গল ও সাফল্যের প্রতীক।
পূজা উপলক্ষ:
ব্যবসায়ীরা নতুন হিসাবের খাতা (হালখাতা) খুলতে এই মাসে গণেশ ও গণেশ্বরী দেবীর পূজা করেন। অনেকে নতুন উদ্যোগ শুরু করার জন্য গণেশ্বরীর আশীর্বাদ নেন। এই সময় বৈশাখী উৎসব পালিত হয়, যা সমৃদ্ধির প্রতীক।
২. জ্যৈষ্ঠ – দেবী ফলহারিণী
অর্থ ও পরিচয়: ফলহারিণী শব্দের অর্থ "ফল দানকারী", অর্থাৎ মা দুর্গার এই রূপ ফল ও খাদ্যের দেবী।
পূজা উপলক্ষ:
সন্তান কামনায় ও পরিবারের কল্যাণ কামনায় ফলহারিণী কালী পূজা করা হয়। সাধারণত এই পূজা কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয়, কারণ এটি শস্য ও বাগান ফলনের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাঙালি সমাজে গঙ্গার ঘাটে ফলহারিণী ব্রত পালন করা হয়।
৩. আষাঢ় – দেবী কামাখ্যা
অর্থ ও পরিচয়: কামাখ্যা হলেন শক্তি উপাসনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রূপ, যিনি কামরূপ কামাখ্যা মন্দিরে পূজিত হন। তিনি কামনা, উর্বরতা ও নারীত্বের প্রতীক।
পূজা উপলক্ষ:
আষাঢ় মাসে "অম্বুবাচী মেলা" পালিত হয়, যা কামাখ্যা দেবীর পবিত্র রজঃস্বলা (ঋতুমতী) সময় হিসেবে পরিচিত। সাধকেরা কামাখ্যা মন্দিরে গিয়ে শক্তি সাধনা করেন। গৃহস্থ ও তন্ত্রসাধকেরা এই মাসে কামাখ্যা দেবীর বিশেষ পূজা করেন।
৪. শ্রাবণ – দেবী শাকম্ভরী
অর্থ ও পরিচয়: শাকম্ভরী শব্দের অর্থ "শাক-সবজি ও খাদ্যের দাতা"। তিনি কৃষি ও সম্পদের রক্ষা কর্তা।
পূজা উপলক্ষ:
বৃষ্টির জন্য ও শস্য উৎপাদনের জন্য দেবী শাকম্ভরীর পূজা করা হয়। রাজস্থানে এই দেবীর মন্দির আছে, যেখানে প্রতি বছর শ্রাবণ মাসে বিশাল উৎসব হয়। দুর্ভিক্ষের সময় ও খাদ্য সংকটের সময় শাকম্ভরী দেবীর পূজা করা হয়।
৫. ভাদ্র – দেবী পার্বতী
অর্থ ও পরিচয়: পার্বতী হলেন শিবের অর্ধাঙ্গিনী এবং শক্তির প্রতীক। তিনি গৃহস্থ জীবনের শান্তি ও সংস্থানের দেবী।
পূজা উপলক্ষ:
বিবাহিত মহিলারা "তেজ পূজা" বা "হরিতালিকা তিজ ব্রত" পালন করেন স্বামীর দীর্ঘায়ুর জন্য।
কাঠমান্ডু ও নেপালে এই ব্রত বিশেষভাবে প্রচলিত। কন্যাদের মঙ্গল কামনায় এই মাসে দেবী পার্বতীর পূজা করা হয়।
৬. আশ্বিন – দেবী দুর্গা
অর্থ ও পরিচয়: আশ্বিন মাসে দেবী দুর্গা মহিষাসুরমর্দিনী রূপে পূজিত হন।
পূজা উপলক্ষ:
দুর্গাপূজা বা শারদীয়া দুর্গোৎসব এই মাসের প্রধান উৎসব। বাঙালি হিন্দু সমাজের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান এটি। দেবী দুর্গা ১০ দিন ধরে পূজিত হন এবং বিজয়া দশমীতে বিসর্জন দেওয়া হয়।
৭. কার্তিক – দেবী জগদ্ধাত্রী
অর্থ ও পরিচয়: "জগদ্ধাত্রী" মানে "বিশ্বের রক্ষক"। তিনি জ্ঞান, ধৈর্য ও সংযমের প্রতীক।
পূজা উপলক্ষ:
এই মাসে বিশেষভাবে নদীয়া, চন্দননগর এবং পশ্চিমবঙ্গের কিছু এলাকায় জগদ্ধাত্রী পূজা হয়। জগদ্ধাত্রী দেবীকে সর্বশক্তিমান ও সর্বমঙ্গলময়ী হিসেবে পূজা করা হয়।
৮. অগ্রহায়ণ – দেবী কাত্যায়নী
অর্থ ও পরিচয়: কাত্যায়নী হলেন নবদুর্গার ষষ্ঠ রূপ, যিনি কৃষ্ণের আরাধ্য দেবী ছিলেন।
পূজা উপলক্ষ:
কাত্যায়নী ব্রত পালন করা হয় অবিবাহিত নারীদের জন্য, যাতে তাঁরা ভালো জীবনসঙ্গী পান। মা কাত্যায়নী নারীশক্তির এক মহিমান্বিত রূপ।
৯. পৌষ – পৌষ কালী
অর্থ ও পরিচয়: পৌষ মাসে কালী দেবীকে তন্ত্রসাধনার মাধ্যমে পূজা করা হয়।
পূজা উপলক্ষ:
পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে কালী পূজা করা হয়।
এটি মূলত গোপন সাধনার সময়, যেখানে তান্ত্রিকরা দেবী কালীর আরাধনা করেন।
১০. মাঘ – রটন্তী কালী
অর্থ ও পরিচয়: "রটন্তী" মানে "প্রচারিত বা ব্যাপকভাবে পূজিত"।
পূজা উপলক্ষ:
রটন্তী কালী পূজা মাঘ মাসে সাধনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তন্ত্রমতে এই সময় কালী পূজা করলে সিদ্ধিলাভ করা যায়।
১১. ফাল্গুন – সংকটনাশিনী
অর্থ ও পরিচয়: সংকটনাশিনী মানে "বিপদ নাশকারী"। মা দুর্গার এই রূপ সমস্ত বাধা ও বিপদ থেকে মুক্তি দেন।
পূজা উপলক্ষ:
বিশেষভাবে যারা জীবনে বাধা-বিপত্তির মধ্যে আছেন, তারা এই মাসে সংকটনাশিনী দেবীর পূজা করেন। এই পূজা দুর্গতি নাশের জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয়।
১২. চৈত্র – দেবী অন্নপূর্ণা
অর্থ ও পরিচয়: মা অন্নপূর্ণা হলেন অন্ন ও খাদ্যের দেবী।
পূজা উপলক্ষ:
চৈত্র মাসে মা অন্নপূর্ণার পূজা বিশেষভাবে অনুষ্ঠিত হয় খাদ্যের প্রাচুর্যের কামনায়।বারাণসীর অন্নপূর্ণা মন্দিরে বিশেষভাবে এই পূজা করা হয়।
বছরের প্রতিটি মাসেই মা দুর্গার বিভিন্ন রূপের পূজা করা হয়। এগুলি শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বরং জীবনযাত্রার বিভিন্ন দিককে প্রতিফলিত করে। কৃষি, স্বাস্থ্য, সংসার, বিবাহ, বিপদ ও সিদ্ধিলাভ—সব ক্ষেত্রেই দেবী দুর্গার বিশেষ রূপ উপাসনা করা হয়, যা সনাতন ধর্মের শক্তি সাধনার এক অনন্য দিক।
.jpg)
0 Comments