আজ আনন্দময়ী মায়ের শুভ আবির্ভাব তিথি
3/5/2025 Raton Karmoker
আনন্দময়ী মা বলতেন, ”খণ্ড আনন্দে প্রাণ তৃপ্ত হইতেছে না, তাই মানুষ অখণ্ড আনন্দ পাইবার জন্য অখণ্ডের সন্ধান করিতেছে।’
শ্রী আনন্দময়ী মা হিন্দু আধ্যাত্মিক সাধিকা। ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার খেওড়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস ছিল একই জেলার বিদ্যাকুট গ্রামে। পিতা বিপিনবিহারী ভট্টাচার্য মুক্তানন্দ গিরি নামে সন্ন্যাসজীবন গ্রহণ করেন। হয়তো পৈতৃক সূত্রেই আনন্দময়ীর মধ্যেও আধ্যাত্মিক চেতনা জাগ্রত হয়, কারণ ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে দৈবশক্তির লক্ষণ দেখা দেয়। তখন থেকেই হরিনামকীর্তন শুনে তিনি আত্মহারা হয়ে যেতেন।
আন্দময়ীর প্রকৃত নাম নির্মলা সুন্দরী; দাক্ষায়ণী, কমলা ও বিমলা নামেও তিনি পরিচিত ছিলেন। তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না বললেই চলে। ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে বিক্রমপুরের রমণীমোহন চক্রবর্তীর সঙ্গে তার বিবাহ হয়। প্রথম দিকে তাঁকে উন্মাদ বা হিস্টিরিয়া ব্যাধিগ্রস্ত বলে সাব্যস্ত করা হয়। কিন্তু প্রাণগোপাল মুখোপাধ্যায় তাঁকে মহাভাবের সাধিকারূপে আবিষ্কার করেন। স্বামীও পরবর্তীকালে সন্ন্যাস গ্রহণ করে ভোলানাথ নামে পরিচিত হন। রমণীমোহন ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকার নবাবের বাগানের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত হলে নির্মলা তার সঙ্গে শাহবাগে চলে আসেন এবং সিদ্ধেশ্বরীতে কালীমন্দিরে বেশ কয়েকবছর অবস্থান করে ধর্মকর্মে আত্মনিয়োগ করেন। এই মন্দিরেই একদিন দিব্যভাবে মাতোয়ারা নির্মলা আনন্দময়ী মূর্তিতে প্রকাশিত হন এবং তখন থেকেই তার নাম হয় আনন্দময়ী মা। ঢাকার রমনায় তার আশ্রম গড়ে ওঠে। তার আধ্যাত্মিক ভাবধারায় অনেক গুণিজন আকৃষ্ট হন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুজন হলেন মহামহোপাধ্যায় গোপীনাথ কবিরাজ এবং ডাক্তার ত্রিগুণা সেন। নৃত্যশিল্পী উদয়শঙ্করও নৃত্য সম্পর্কে আনন্দময়ীর বিশ্লেষণ শুনে মুগ্ধ হয়েছিলেন। মা আনন্দময়ীর মতে জগৎটাই নৃত্যময়; জীবের মধ্যে যে প্রাণের স্কন্দন, এমনকি বীজ থেকে যখন অঙ্কুরোদগম হয় তখন সেখানেও এক ধরনের তরঙ্গময় নৃত্যের সৃষ্টি হয়। এই তরঙ্গরূপ নৃত্য যে মূল থেকে উদ্ভূত হয়, একসময় স্তিমিত হয়ে আবার সেই মূলেই মিলিয়ে যায়। এই রূপকের মধ্য দিয়ে তিনি মূলত জীবাত্মা ও পরমাত্মার সম্পর্ককেই নির্দেশ করেছেন।
১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে আনন্দময়ী স্বামীর সঙ্গে উত্তর ভারতের দেরাদুনে চলে যান এবং সেখানে তার লীলাক্ষেত্র ক্রমশ সম্প্রসারিত হয়। তিনি মানুষকে আধ্যাত্মিক ভাবে উদ্বুদ্ধ করার জন্য উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থান পরিভ্রমণ করেন। তার একটি বিশেষ কীর্তি হলো প্রাচীন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তীর্থস্থান নৈমিষারণ্যের পুনর্জাগরণ ঘটানো। সেখানে গিয়ে তিনি নতুন করে মন্দির স্থাপন এবং যজ্ঞ, কীর্তন ইত্যাদির মাধ্যমে ভগবৎসাধনার ক্ষেত্র তৈরি করেন। এভাবে মানুষকে আধ্যাত্মিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত করার উদ্দেশ্যে তিনি ভারতের বিভিন্ন স্থানে পুরাতন তীর্থসমূহের সংস্কার সাধন এবং নতুন নতুন তীর্থস্থান প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশের রমনা ও খেওড়াসহ ভারতের বারাণসী, কনখল প্রভৃতি স্থানে তার নামে আশ্রম, বিদ্যাপীঠ, কন্যাপীঠ, হাসপাতাল ইত্যাদি গড়ে উঠেছে। তার নামে এরূপ মোট ২৫টি আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
পরমানন্দের সন্ধানেই তাঁর জীবন কেটেছে সাধনায়। কৈশোরে এবং পরবর্তীকালে বিবাহিত জীবনেও তিনি ভাবজগতে বেশিরভাগ সময় ডুবে থাকতেন বলে জানা যায়।
প্রথম প্রথম তাঁর ভাবসমাধির কারণ বুঝতে পারতেন না কাছের লোকজন। কিন্তু আস্তে আস্তে তাঁর স্বামীও আনন্দময়ী মায়ের মধ্যে ঈশ্বরচেতনাকে উপলব্ধি করেন। শোনা যায় তাঁর স্বামী বাবা ভোলানাথ, কালীপুজোর সময়ে আনন্দময়ীকেও একই রূপে দেখতেন এবং তখন তিনিও আনন্দময়ীকে মা রূপে পুজো করতেন।
শোনা যায় আনন্দময়ী মা-কে তাঁর ভক্তরা কখনও ছিন্নমস্তার মূর্তিতে, কখনও ভুবনেশ্বরী মূর্তিতে আবার কখনও বা সরস্বতী রূপে দেখেছিলেন।
আনন্দময়ী মায়ের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী, সুভাষচন্দ্র বসু, কমলা নেহরু, পরমহংস যোগানন্দ ও মাধব পাগলা সহ আরো অনেকে।
সংসারটা ভগবানের; যে যে অবস্থায় আছে, সেই অবস্থায় থেকে কর্তব্যকর্ম করে যাওয়া মানুষের কর্তব্য।’ এটাই আনন্দময়ীর মুখ্য বাণী।
মায়ের এই সংক্ষিপ্ত জীবনী এক মাতৃসাধকের কবিতায় শেষ করছি।
***#আনন্দময়ী
দুর্গা দুর্গা দুর্গা দুর্গতী নাশিনী,
শুধু অসুর নাশিতে ধরায় তুমি আসনি । কল্যাণী, মঙ্গলময়ী, স্নেহময়ী, মহামায়া,
সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে রয়েছে তব ছায়া।
হিমালয়ের পাদদেশে গিরিরাজ্যের তুমি কল্যাণ কন্যারূপে তোমায় পেয়ে দক্ষরাজ হয়েছেন ধন্যা
সতী দেহ ধারণ কোরে গড়েছ একান্ন পীঠ, তোমারে শ্রদ্ধা, অর্ঘ দেওয়া জগৎ জনের উচিৎ।
প্রতি বৎসর শরৎ কালে তোমার দেই মোরা পূজা,
বসন্ত কালের পূজাতেও তোমার দেখি দশভূজা,
গৃহে গৃহে নারী রূপে দেখি তোমারে কল্যাণী, সর্ব্ব নারীর ভিতরে মাতৃরূপে রয়েছ জগৎ জননী ।
কত, কত, পুঁথিতে তোমার শত নাম দেখি, আদরের দুর্গা নামে পূজিতা তুমি এই বঙ্গভূমি । জগতের হিতে, মানবের গৃহেতে জন্মেছ কত শতবার
কলির শেষেতে আনন্দময়ী রূপে জন্মেছ একবার।
তোমার স্নেহ মায়া মমতা ও কল্যাণের তুমি
ধন্য ভক্তরা, জন্ম যাদের বঙ্গে ও ভারতভূমি ।
(মাতৃ সাধক শ্রী জীবন গোস্বামী (বাবু লাল),
পূজারী--সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির, ঢাকা,
বাংলাদেশ)
✍️ ব্যাখ্যাঃ রতন কর্মকার (whatsapp: +8801811760600)
0 Comments